উদ্ধার করা মাদকদ্রব্য ও নগদ অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ, সোর্সমানি না দেওয়া এবং প্রতিবাদ করায় তথ্যদাতাকে (সোর্স) আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) শামিম আহমেদ, উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার বাদী আবুল খায়ের অভিযোগ করেছেন, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলা করার পর তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৬ জুলাই পরিচালিত কয়েকটি মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার হওয়া ইয়াবা, হেরোইন ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ মামলার নথিতে উল্লেখ না করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় তথ্যদাতা আবুল খায়েরকে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় দায়ের করা সিআর মামলা নম্বর ১০৭৯/২০২৬-এর তদন্তভার আদালত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দিয়েছেন।
অভিযোগ ওঠার পর উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত (প্রত্যাহার) করা হয়েছে। তবে উপপরিচালক শামিম আহমেদ এখনও নিজ পদে বহাল রয়েছেন।
এদিকে পৃথক এক অফিস আদেশে ডিএনসি পরিচালক (নিরোধ, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা) রাজীব আহসানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সরেজমিন তদন্ত করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
মামলার বাদী আবুল খায়ের দাবি করেন, নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় পরিচালিত তিনটি অভিযানের তথ্য তিনি উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান এবং বিমানবন্দর সার্কেলের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ রোকুনুজ্জামানকে দিয়েছিলেন।
তার দাবি, ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম অভিযানে ১ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা, দ্বিতীয় অভিযানে ৪০০ গ্রাম হেরোইন এবং তৃতীয় অভিযানে ২০ হাজার পিস ইয়াবা ও ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে উদ্ধার হওয়া আলামত ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
আবুল খায়ের আরও অভিযোগ করেন, তালিকাভুক্ত এক মাদক ব্যবসায়ীকে যোগসাজশের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তথ্যদাতা হিসেবে চুক্তি অনুযায়ী সরকারের বরাদ্দকৃত সোর্সমানিও তাকে দেওয়া হয়নি।
বাদীর দাবি, মামলার নথিতে জব্দ করা নগদ অর্থ ৫০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার হয়েছিল। একইভাবে ২০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ দেখানো হলেও প্রকৃত উদ্ধার হয়েছিল অন্তত ৪০ হাজার পিস এবং ৪০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ দেখানো হলেও প্রকৃত পরিমাণ ছিল প্রায় দেড় কেজি।
তার অভিযোগ, উদ্ধার হওয়া আলামত ও অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
আবুল খায়ের বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রথমে ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক শামিম আহমেদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু অভিযোগের তদন্তের পরিবর্তে তাকে অফিসে ডেকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
পরবর্তীতে তিনি ডিএনসির মহাপরিচালকের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মহাপরিচালক পরিদর্শক জিল্লুর রহমানকে তলব করে ভর্ৎসনা করেন এবং তার প্রাপ্য সোর্সমানি পরিশোধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
তবে তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবুল খায়ের। তার অভিযোগ, তদন্ত কমিটির সদস্যসচিবের সঙ্গে অভিযুক্ত পরিদর্শক জিল্লুর রহমানের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে এবং এ বিষয়ে অর্থের প্রভাব খাটানোরও চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
আবুল খায়ের বলেন,‘পশ্চিম সানারপাড়ের এক অভিযানে ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার দেখিয়ে বাকি দুই লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া ইয়াবা ও হেরোইনের একটি অংশ গায়েব করা, টাকার বিনিময়ে নিরীহ মানুষকে আসামি করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে উপপরিচালক শামিম আহমেদ, পরিদর্শক জিল্লুর রহমানসহ অন্যরা নির্যাতন করেছেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। আমি আশা করি তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলা দায়েরের পর থেকে তিনি নিজের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে।
-টিএস