সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার, বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মাহবুবুর হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। কিন্তু তার পরেও তাকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য নাম প্রস্তাব করায় প্রশাসনিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে গত ১ জুলাই জারি করা এক প্রস্তাবপত্রে বলা হয়, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) পদে একজন কর্মকর্তা আগামী ১ সেপ্টেম্বর অবসরে যাওয়ায় শূন্য পদে মাহবুবুর হক চৌধুরীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি গণপূর্তের ই/এম সার্কেল-৩, ঢাকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট একাধিক অভিযোগ ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাহবুবুর হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং ঠিকাদারদের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংসদ অধিবেশন চলাকালে একাধিকবার সাউন্ড সিস্টেমে বিভ্রাট ঘটার পর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অভিযোগ রয়েছে, স্থাপন ও সংস্কার কাজে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফার্নিচার কেনা কাটায় মাহবুবুর হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এ কাজে প্রায় ৯ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। মাহবুবুর হক চৌধুরীর প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের যোগসাজশ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই)-এর একটি ভবন নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকা অনিয়মের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমে ত্রুটি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কাঠের আসবাবপত্র ক্রয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
১৭ কোটি টাকার বিল নিয়ে প্রশ্ন গণপূর্তের ই/এম সার্কেল-৩-এর একটি প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী ঠিকাদার আলাউদ্দিন ওয়াজেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, অনুমোদিত বিলের বিপরীতে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই)-এর ভবন নির্মানের অনিয়ম ও নিয়ম বানিয়ে ফেলে ওয়ান ইলেভেনে'র সময় বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল ও সাংসদ সদস্য মাসুদ ভাগিনা উদ্দিন চৌধুরীর এর ভাগিনা। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মামারি প্রভাব খাটিয়ে ১৭ বছর গণপূর্ত অধিদপ্তরের লোভনীয় ছিল তার পদায়ন। 5 আগস্ট এর রেজিম পরিবতনের সাথে সাথে ডিগবাজি দিয়ে প্রথমে জামাত পরে বিএনপি হয়ে যান।
নিয়মিত যাচাই-বাছাই ছাড়াই কিছু বিল দ্রুত অনুমোদনের অভিযোগও করা হয়েছে। ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’ পরিচালনার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ই/এম সার্কেল-৩-এর টেন্ডার ও ক্রয় কার্যক্রমে মাহবুবুর হক চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ঠিকাদারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগও রয়েছে। বিপুল সম্পদের অভিযোগ অভিযোগ অনুযায়ী, মাহবুবুর হক চৌধুরীর নামে ঢাকার ইকবাল রোডে একাধিক ফ্ল্যাট, আগারগাঁওয়ে চারতলা ভবন, উত্তরা ও বসুন্ধরায় একাধিক প্লট, আফতাবনগরে জমি এবং বনশ্রী-আমুলিয়া এলাকায় প্রায় ১৫ বিঘা জমি রয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদের ভাষ্য, “১৭ কোটি টাকার বিলটি এই প্রভাব বলয়ের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে।” তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের বড় অঙ্কের বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে তা উদ্বেগজনক। অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।” তিনি আরও জানান, টেন্ডার ও বিল প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে, তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রয়োজন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি প্রকল্পে বড় অঙ্কের আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। তার ভাষায়, “নথিপত্রে বৈষম্য বা আর্থিক অস্বচ্ছতা পাওয়া গেলে তা অনুসন্ধানের আওতায় পড়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে পারে।”