ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
দুর্ঘটনা কমানোর অঙ্গীকার, বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ-তবু পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের ঝুঁকি কাটেনি
বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা: বাস্তবে কতটা এগিয়েছে দেশ?
✎ তানভীর সানি
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম আপডেট: ২১.০৭.২০২৬ ১২:৪৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার এখন আর শুধু নীতিগত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে আইন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও দুর্ঘটনাপরবর্তী জরুরি সেবায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল কতটা মিলছে? দেশের সড়কগুলো কি সত্যিই আগের চেয়ে নিরাপদ হচ্ছে?

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ৫৬১ জন আহত হয়েছেন বলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিহতদের মধ্যে ১৩৪ জনই ছিলেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার, আর ৯১ জন ছিলেন পথচারী। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং পাঁচ ভাগের এক ভাগের বেশি পথচারী নিহত হয়েছেন।

এর আগে এপ্রিলেও দেশের সড়কে ৪৬৩টি দুর্ঘটনায় ৪০৪ জন নিহত ও ৭০৯ জন আহত হন বলে আরএসএফের তথ্য প্রকাশিত হয়। ওই মাসে মোট মৃত্যুর ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং ২৫ দশমিক ২৪ শতাংশ পথচারী নিহত হন। দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ২৮ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে এবং ৪১ দশমিক ৬৮ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে।

সড়ক নিরাপত্তার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দুটি শ্রেণির মানুষের ঝুঁকি বিশেষভাবে চোখে পড়ে-পথচারী এবং মোটরসাইকেল আরোহী।

ঢাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে রাজধানীতে ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত ও ৫১১ জন আহত হন। নিহতদের ৪৭ শতাংশের বেশি ছিলেন পথচারী। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ছিলেন প্রায় ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিলেন পথচারী অথবা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী।

এ বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা চালকদের শাস্তি দিয়ে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিরাপদ ফুটপাত, পারাপারের ব্যবস্থা, জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভারব্রিজের কার্যকর ব্যবহার, সড়কের আলো, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং মোটরসাইকেল চালকদের নিরাপত্তা-সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে মহাসড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক চার বা ছয় লেনে উন্নীত হয়েছে, নির্মিত হয়েছে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে ও বাইপাস। এতে যাতায়াতের সময় কমেছে এবং যোগাযোগব্যবস্থায় গতি এসেছে।

তবে সড়কের অবকাঠামো উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের গতি বেড়েছে। ফলে গতি নিয়ন্ত্রণ, সড়কের নকশা, পথচারী পারাপার ও স্থানীয় যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের এপ্রিলের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনার বড় অংশ ঘটেছে। অর্থাৎ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নয়, দেশের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো শনাক্ত করে সেগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে কমিউনিটি ফার্স্ট রেসপন্ডার প্রকল্পের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। একটি ব্যস্ত জাতীয় মহাসড়কের ৪০ কিলোমিটার এলাকায় পরিচালিত এই পাইলট প্রকল্পে ১২০ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত ছিলেন। তারা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং প্রয়োজনে আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

প্রকল্পটির আওতায় ৬২৫ জন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী দুর্ঘটনার ৩০ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

এ উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নয়-দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সড়ক নিরাপত্তার নতুন অধ্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা সামনে এসেছে।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি। শুধু ক্যামেরা স্থাপন বা জরিমানা আদায় করলেই দুর্ঘটনা কমবে না। কোন সড়কে কত গতিতে যানবাহন চলা নিরাপদ, কোথায় পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা দরকার, কোন স্থানে আলো বাড়ানো জরুরি-এসব সিদ্ধান্ত নিতে দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকার ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে। সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে এই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত গতি, ভুল পথে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, হেলমেট না পরা, চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার-এসব আচরণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও কার্যকর না থাকলে আইন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্বে বছরে প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ মারা যায়। নিহতদের অর্ধেকের বেশি পথচারী, সাইকেল আরোহী ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যও নির্ধারিত রয়েছে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্ঘটনার পর জরুরি সাড়া দেওয়ার নতুন মডেল এবং সমন্বিত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ-সবই ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

তবে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি এখনো কঠিন। বিশেষ করে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন। রাজধানী থেকে মহাসড়ক-সবখানেই নিরাপদ চলাচলের জন্য অবকাঠামো, আইন, চালকের দক্ষতা এবং জনসচেতনতা একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সড়ক নিরাপত্তার সাফল্য শুধু কতটি নতুন আইন হলো বা কতটি সড়ক চার লেনে উন্নীত হলো-তা দিয়ে মাপা যাবে না। সাফল্যের আসল মাপকাঠি হবে, কতজন মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন।

২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের হাতে এখন প্রায় সাড়ে তিন বছরের মতো সময়। এই সময়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি মৃত্যুহার কমানো, পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মহাসড়ককে আরও নিরাপদ করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ সড়ক নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার বিষয় নয়-এটি মানুষের জীবন রক্ষার জাতীয় দায়িত্ব।


-টিএস


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝