একসময় স্মার্টফোন আসক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হতো তরুণ প্রজন্মকে ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। এখন শুধু তরুণ নয়, বাড়ির বাবা-মা কিংবা প্রবীণ সদস্যদেরও দিনের বড় একটি অংশ কাটছে স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ রেখে।
অবসর পেলেই ফেসবুক স্ক্রল করা, ইনস্টাগ্রামের রিলস দেখা, ইউটিউব ভিডিও উপভোগ করা কিংবা মোবাইল গেমে সময় কাটানো—অনেক প্রবীণের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা একা থাকেন বা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকেন, তাদের কাছে স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে একাকীত্ব দূর করার সহজ সঙ্গী।
তবে প্রশ্ন হলো, এই অভ্যাস কতটা স্বাভাবিক আর কখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
স্মার্টফোন সব সময় ক্ষতিকর নয়
প্রবীণ কেউ নিয়মিত মোবাইল ব্যবহার করছেন মানেই সেটি ক্ষতিকর—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে স্মার্টফোন তাদের মানসিকভাবে সক্রিয় রাখতে পারে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও কলে যোগাযোগ, বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে দাবা বা লুডু খেলা, নতুন কিছু শেখার ভিডিও দেখা কিংবা পছন্দের গান শোনা—এসব কার্যক্রম প্রবীণদের আনন্দ দিতে পারে। পাশাপাশি এটি একাকীত্ব কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব প্রবীণ সন্তান বা স্বজনদের থেকে দূরে থাকেন, তাদের জন্য নিয়মিত ভিডিও কল মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কখন স্মার্টফোন ব্যবহার হয়ে ওঠে সমস্যা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন স্মার্টফোন দিনের প্রধান বা একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস বা শর্ট ভিডিও দেখা, একের পর এক কনটেন্ট স্ক্রল করতে করতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা, হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়ামের সময় কমে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা কমিয়ে দেওয়া কিংবা রাত জেগে ফোন ব্যবহার করা—এসব অতিরিক্ত ব্যবহারের লক্ষণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস বজায় থাকলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শরীর ও মনের ওপর প্রভাব
অতিরিক্ত সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে শারীরিক সক্রিয়তা কমে যায়। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি, ঘাড় ও কোমরের ব্যথা, চোখে চাপ বা ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া রাতে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুমের মান নষ্ট হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে দিনের বেলায় ক্লান্তি, বিরক্তি এবং মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ছোট ভিডিও দেখার অভ্যাস মস্তিষ্ককে সব সময় নতুন ও দ্রুত উত্তেজক তথ্যের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলতে পারে। ফলে বই পড়া বা দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজে যুক্ত থাকার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
পরিবারের ভূমিকা কী হতে পারে?
প্রবীণদের স্মার্টফোন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা অনেক সময় কার্যকর হয় না। বরং প্রয়োজন ভারসাম্য তৈরি করা।
পরিবারের সদস্যরা তাদের নিয়মিত হাঁটাচলা, হালকা ব্যায়াম, বই পড়া, বাগান করা, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো কাজে উৎসাহ দিতে পারেন। একই সঙ্গে খাবারের সময়, পারিবারিক আড্ডা কিংবা ঘুমানোর আগে কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস তৈরি করাও উপকারী হতে পারে।
প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার
স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রবীণদের ফোন ব্যবহার নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে যদি দেখা যায়, ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, পারিবারিক সম্পর্ক বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য। কিন্তু যখন প্রযুক্তিই মানুষের সময় ও অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটি ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রবীণদের জন্যও প্রয়োজন স্মার্টফোন ব্যবহারে সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনের সঙ্গে প্রযুক্তির একটি সুস্থ ভারসাম্য।
সূত্র: ফোর্বস, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন, টাইমস অব ইন্ডিয়া