ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
সিরিয়ার এক গ্রাম, যেখানে নারীরাই সব, পুরুষদের থাকতে মানা
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:২৮ এএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

জিনওয়ার। সিরিয়ার নারী–অধ্যুষিত একটি গ্রাম। বাগান, ফুল, শাকসবজি আর ফলের গাছে ঘেরা প্রায় ৩০টির মতো মাটির ঘর নিয়ে এই জনপদ। তার প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী। কাঁধে রাইফেল, হাতে ওয়াকিটকি। তিনি একজন মা-ও।

সিরিয়ার কুর্দি-অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কামিশলি শহরের ঠিক বাইরে এই গ্রাম যেন ধুলার ধূসরতার মাঝে এক উজ্জ্বল রঙের আভা। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা জিনওয়ার নামের গ্রামটি কুর্দি, আরব ও ইয়াজিদি নারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। ইসলামিক স্টেটের হাতে অত্যাচারিত, স্বামী হারানো কিংবা বৈবাহিক নির্যাতনের শিকার নারীরা নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও টিকে থাকার লড়াইয়ে জড়ো হয়েছেন এখানে, একটি মুক্ত জীবনযাপনের লক্ষ্যে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সহিংসতা, বৈষম্য এবং নানান প্রতিকূলতার প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য ‘জিনওয়ার’ গ্রামটি গড়ে ওঠে। এর নামটি কুর্দি শব্দ ‘জিন’ (নারী) এবং ‘ওয়ার’(ঘর, ভূমি বা স্থান)-এর সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ ‘নারীস্থান’। এই স্থানটি এখন সেই নারীদের জন্য, যাঁরা মুক্ত ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চান, যাঁরা বিয়ের বন্ধন আর চান না।

এখানে প্রায় ২৫ জন নারীর বসবাস। সঙ্গে তাঁদের সন্তান এবং গরু, ভেড়া, মুরগি, ময়ূরসহ বিভিন্ন পশুপাখি। মাটি, পানি ও খড় দিয়ে তৈরি ইট ব্যবহার করে নিজেরাই তৈরি করেছেন নিজেদের ঘর। গড়ে তুলেছেন নিজেদের স্কুল। নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য আসে নিজেদের উৎপাদিত বেগুন, টমেটো, মরিচ, শসা, পেঁয়াজ ও রসুন থেকে। নারী-নেতৃত্বের এই জনপদে পুরুষদের প্রবেশ শুধুই পরিদর্শক হিসেবে, বসবাস কিংবা রাত কাটানো নিষেধ।
আলোকচিত্র শিল্পী মাত্তেও ত্রেভিসান উত্তর-পূর্ব সিরিয়াজুড়ে গড়ে ওঠা নারী-নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সম্প্রদায়কে নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেছেন। তাতেই উঠে এসেছে জিনওয়ারের নারীদের জীবনচিত্র। জিনওয়ারের পাশাপাশি তিনি পাশের গ্রাম জারুদির নারীদের জীবন, কামিশালির নারী নাগরিক প্রতিরক্ষা কমিটিতে নারীদের কার্যক্রমও তুলে ধরেছেন।

জিনওয়ারের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী ওয়েলাত। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আশ্রয়ের খোঁজে এক বছরের কিছু সময় আগে তিনি এই গ্রামে আসেন। এই নারী বলেন, ‘জীবনটা ঠিকঠাক চলছিল না, বেঁচে ছিলাম কোনোমতে।’

নারীদের জন্য তৈরি গ্রামটির কথা শুনে জিনওয়ারমুখী হন ওয়েলাত। তিনি বলেন, ‘এখানে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, আমার প্রকৃত সত্তাকে।’

ওয়েলাত প্রতিদিন সকালে কুর্দি ভাষার ক্লাসে অংশ নেন। এরপর গ্রামের প্রবেশপথে নিজের নির্ধারিত পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। এখানকার নারীরা গ্রাম পরিচালনার বিভিন্ন কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। নিয়মিত দর্শনার্থীদের আসা-যাওয়া এবং ব্যবসা ও আলাপচারিতার নতুন নতুন সুযোগও তৈরি হয় এখানে। ওয়েলাত বলেন, ‘অনেক অতিথি এখানে আসেন। তাঁদের সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হয়, কাজ হয়।’

সংহতি আর পারস্পরিক সহযোগিতাই এই জনপদের মূলমন্ত্র। ওয়েলাত বলেন, ‘মায়েরা এখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। এখানকার নারীদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো অত্যন্ত চমৎকার। মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ বেশ ভালো এবং সবার মনোবল খুব দৃঢ়।’

ওয়ালেতকে যে শান্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছে জিনওয়ার, তা তিনি সিরিয়ার আর কোথাও খুঁজে পাননি। তিনি বলেন, ‘বাইরের দুনিয়ায় জীবন অনেক বেশি কঠিন। এখানে সবকিছু ভিন্ন। এখানে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। এখানে আমি একটি সুন্দর জীবন কাটাতে পারি।’

ওয়ালেতের চাওয়া, এই জনপদের কথা যেন এর দেয়ালের বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই, পৃথিবীর সব মা তাঁদের নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হোক। তাঁদের শক্তি হবে তাঁদের স্বাধীনতা।’

৫৭ বছর বয়সী নুজিন মিহেমেদ স্বামীর মৃত্যুর পর সাড়ে চার বছর আগে জিনওয়ারে আসেন। আল-দিরবাসিয়ার নিকটবর্তী একটি গ্রামে একাকী বসবাস এবং অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। তাঁকে এই জনপদে আসতে উৎসাহিত করেছিলেন বন্ধুরা।

মিহেমেদ বলেন, ‘আমি অনেক ভুগেছি। প্রচুর কষ্ট সহ্য করেছি। তথাকথিত নৈতিকতা এবং সমাজ—দুই দিক থেকেই আমি নিপীড়িত।’

মিহেমেদ আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজে কোনো দয়ামায়া নেই। এমনকি আমার নিজের পরিবারের মধ্যেও; আমার ভাইবোনেরা আমার ওপর অত্যাচার করেছে।’

মিহেমেদ এখানে রুটি বানানো থেকে শুরু করে পাহারার দায়িত্ব—সব ধরনের কাজই করেন। ‘আমরা প্রত্যেকে একে অপরের থেকে আলাদা, কিন্তু আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো,’ বলেন তিনি। ‘যে কাজই থাকুক না কেন, আমরা তা একসঙ্গেই করি।’

জিনওয়ারে এসে শান্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন মিহেমেদ। তিনি বলেন, ‘আমি এই গ্রামকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমার এখানকার জীবন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো।’

২৮ বছর বয়সী আরেক নারী জেসমিন। তিনিও জিনওয়ারে আসেন স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর, পাঁচ বছর আগে। সিরিয়া ছেড়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। জেসমিন বলেন, ‘জার্মানিতে প্রায় চলেই গিয়েছিলাম। ঠিক তখনই আমি এই গ্রামটির খোঁজ পাই, এরপর সবকিছু বদলে যায়।’

নানা জাতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের নারীদের নিয়েই আপন হওয়ার এক অনুভূতি খুঁজে পাচ্ছেন জেসমিন। তিনি বলেন, ‘সব ধর্ম ও বর্ণের নারীরা এখানে একসঙ্গে বসবাস করেন। সব ধর্মের উৎসবই এখানে উদ্‌যাপিত হয়। আমার কাছে এই গ্রামটি বিশ্বের জন্য বিপ্লব ও শান্তির একটি দৃষ্টান্ত। এখানকার নারীদের সম্পর্ক একেবারেই অন্য রকম।’

জেসমিন এখন জিনওয়ারের সঙ্গে এক গভীর আত্মিক টান অনুভব করেন। তিনি বলেন, ‘এখন অন্য কোনো শহরে নিজেকে কল্পনা করাও আমার জন্য কঠিন।’

তবে জেসমিনের আকাঙ্ক্ষা কেবল জিনওয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বের মতো জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন বলে তিনি আশা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সব নারী তাঁদের অধিকার দাবি করুন এবং সব জায়গায় অংশগ্রহণ করুন। নারীরা যখন এগিয়ে যান, তখন সবকিছু বদলে যায়।’

উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার আরেকটি গ্রাম হলো জারুদি। জিনওয়ারের মতো এই গ্রামটি শুধু নারীদের জন্য না হলেও এটিও তৃণমূল পর্যায়ের সামষ্টিক কাঠামো ও সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত। এখানকার নারী ও পুরুষ উভয় কৃষি, স্থানীয় সেবা এবং দৈনন্দিন জীবনের দায়িত্বগুলো ভাগ করে নেন। যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতার মুখে স্বব্যবস্থাপনা এবং স্বনির্ভরশীলতার পথ বেছে নেওয়ার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এই জনপদটি, যেখানে নারীরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করছেন।

সিরিয়া যুদ্ধে ২০১৩ সালে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর বাসিন্দারা এই বসতির কেন্দ্রে একটি গণবাগান তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। আজ এটি গ্রামের জনজীবনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে উৎপাদিত ফসল পাশের বাজারে বিক্রি করা হয় এবং অর্জিত লভ্যাংশ সবাই ভাগ করে নেন।

জারুদি গ্রামের একজন সহপ্রধান নেহরিমান। তিনি তাঁর বাড়ির বাগানটি পরিবারের অন্যদের সঙ্গে মিলে ব্যবহার করেন।

২৮ বছর বয়সী আরেক নারী নেসরিন বোজা এক বছর আগে জারুদিতে আসেন। কোবানিতে (উত্তর সিরিয়ার একটি শহর) নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি এই গ্রামটির কথা শোনেন। বর্তমানে তিনি গ্রাম পরিষদের একজন সদস্য এবং নারী শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠন নিয়ে কাজ করেন।

‘আমি এই জায়গারই মানুষ,’ বলেন নেসরিন; সেই সঙ্গে জানান, গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস এবং কাজ করা তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে।

‘এখানে আসার পর থেকে আমার রাগ অনেক কমেছে এবং সহযোগিতাপরায়ণ হয়ে উঠেছি। আমরা একে অপরের সঙ্গে যেমন একতাবদ্ধ, প্রকৃতির সঙ্গেও তেমনি মিশে আছি। আমি এটি অন্তরে অনুভব করি।’

নেসরিনের মতে, এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতাই তাঁকে এখানে থেকে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই এখানে সমান। আমাদের সামষ্টিক মনোবল অত্যন্ত দৃঢ়।’
কামশিলিতে ‘এইচপিসি-জিন’ নামে একটি নারী নাগরিক প্রতিরক্ষা কমিটি রয়েছে, যেটি বেসামরিক সুরক্ষা, জনসমাগমস্থল পর্যবেক্ষণ এবং সংঘাত ও অস্থিরতার সময়ে সামাজিক সংহতি বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করে। এই দলটি এমন একটি অঞ্চলে কাজ করে, যা বছরের পর বছর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে, এর মধ্যে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইও ছিল।

রমজিয়ে মিহেম্মেদ ইসমাইল, নিসমিয়ে ইমসেদিন ও ওয়াদেন হুসেন সেখমুস এই কমিটির সদস্য। মিহেম্মেদ ইসমাইল বলেন, ‘আমি বিভিন্ন স্মরণসভায় যাই, রাস্তাঘাট, শহর, মানুষ এবং শেষকৃত্য অনুষ্ঠানগুলো পর্যবেক্ষণ করি। একজন মা হিসেবে আমি যুদ্ধ চাই না, বরং শান্তি চাই।’

আরেক সদস্য ইমসেদিন বলেন, ‘২০১৩ সালে আমি মাঠে কাজ করতাম, কিন্তু ২০২৩ সালে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আত্মরক্ষা অপরিহার্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য—এটি ভেতর থেকে আসতে হবে। বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মানুষগুলোর সবাই আমার সন্তান। আমাদের খাবার বা জলের অভাব হলেও আমরা কিছু মনে করি না। আমরা নারী, আমরা কষ্টে অভ্যস্ত এবং লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।’

কুর্দি রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে হুসেন সেখমুস বলেন, ‘বিপ্লবের আগে ১৯৮৭ সালে আমি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম এবং ৪০ বছর গেরিলাদের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছি। আমার ভাই একজন শহীদ। ২০১৬ সালে আমি রোজাওয়া বিপ্লবে (স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সিরিয়ার কুর্দিদের নেতৃত্বে সংগ্রাম) অংশ নিয়েছিলাম। আমার স্বামীও মারা গেছেন।’

সেখমুস চারটি এলাকার দায়িত্ব পালন করেন, যা শহরের প্রায় অর্ধেক। তিনি বলেন, ‘আমি আমার কমিউনের আত্মরক্ষা এবং শহীদদের দলের দায়িত্ব নিয়েছি। স্বাধীনতা অর্জন না করা পর্যন্ত আমরা থামব না।’

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.

Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; 01550707296 Advertisement: 41053012; 01550707291, E-mail: [email protected] [email protected]
🔝