ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরান কী ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুচিন্তিত বক্তব্য, সুপরিকল্পিত কর্মসূচি এবং সংগঠিত জনসমাবেশের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি তাদের সমর্থকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েরলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনে দীর্ঘকালের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, মার্চ মাসে তার ছেলে মোজতবা খামেনি দেশটির শীর্ষ পদে আসীন হন। বর্তমানে খামেনির মৃত্যুকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শাহাদাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়াকে এক প্রকার জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। আল-জাজিরা জানায়, পুরো আয়োজনের মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে’।
মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং কালো-লাল প্রতীকের অন্তরালে
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে খামেনির শেষকৃত্যের প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি নজরকাড়া ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’-এর প্রতীকী চিত্রটির বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি খুদে বার্তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই প্রতীকটি তৈরি করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়ে আলী খামেনি তার ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারিয়েছিলেন; তবে মোজতবার বার্তা অনুযায়ী, সেই চরম সংকটের মুহূর্তেও খামেনির সুস্থ বাম হাতটি মুষ্টিবদ্ধ ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে মোজতবা খামেনি নিজে বাবার কোনো জানাজা বা শোকযাত্রায় প্রকাশ্যে অংশ না নিলেও, এই মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়েই তিনি সমর্থকদের প্রতিরোধের বার্তা দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি পুরো আয়োজনে কালো ও লাল রঙের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছে, যা একই সাথে গভীর শোক, শাহাদাত এবং শত্রুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধের আহ্বানকে নির্দেশ করে। রাজধানী তেহরানের বৃহত্তম ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে খামেনির মরদেহের পাশে একটি বিশাল লাল পতাকা ওড়ানো হয়েছে, যা কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির সাথে খামেনির হত্যাকাণ্ডকে যুক্ত করে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াকে ধর্মীয় দায়িত্বে রূপ দেওয়ার একটি চেষ্টা।
শিয়া সম্প্রদায়ের মানচিত্র ও শোকযাত্রার রুট
খামেনির মরদেহ বহনের জন্য যে রুটটি নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও আল-জাজিরা তুলে ধরেছে। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ থেকে শুরু হয়ে এই শোকযাত্রা যাবে দক্ষিণ ইরানের পবিত্র শহর কোমে। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকের শিয়া ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রধান দুই কেন্দ্র নাজাফ ও কারবালা অতিক্রম করবে। সবশেষে মরদেহ সমাহিত করা হবে ইরানের মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, শিয়া বিশ্বের প্রধান প্রধান আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে স্পর্শ করে যাওয়া এই রুটটি মূলত গত পাঁচ দশক ধরে জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আদর্শিক প্রভাব বিস্তারের যে প্রয়াস, তারই এক সুনিপুণ প্রতীকী রূপ।
বিদেশি প্রতিনিধিদল ও কোরআনের আয়াতের কূটনৈতিক বার্তা
খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এবং ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনে উপস্থিতিতে তেহরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা অঞ্চলের মিত্রদের শক্ত অবস্থান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কফিনের সামনে উপস্থিত প্রতিটি বিদেশি প্রতিনিধিদলের জন্য ইরানের রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনের সুনির্দিষ্ট কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং পাকিস্তানের জন্য আনুগত্য ও অবিচলতার আয়াত বেছে নেওয়া হলেও, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সাথে চলমান সংলাপে তাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা আলাদাভাবে স্মরণ করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে সৌদি আরবের (রিয়াদ) প্রতিনিধিদলের সামনে বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ আয়াতটির তিলাওয়াত। যেখানে শত্রুর সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও মুমিনদের ঐশ্বরিক বিজয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। শিয়া-সুন্নি আঞ্চলিক সমীকরণ এবং রিয়াদের সাথে তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আয়াত নির্বাচনকে মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্লেষকেরা অত্যন্ত গভীর ও কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসএ