ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ইরানের নতুন নেতৃত্ব যেসব জায়গায় পুরোনোদের থেকে আলাদা
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৮:২১ এএম
X Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন গত মাসে ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন, সে সময় অনেকে একে ইতিহাসের এক চরম পরিহাস হিসেবে দেখেন।

আতিথেয়তা দেওয়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ হয়তো ট্রাম্প মত বদলানোর আগেই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়াটা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্পকে খুশি করতে তিনি সম্ভবত রাজকীয় ‘হল অব মিররস’ ভেন্যু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

তবে ভেন্যু বাছাইয়ের বিষয়টি অবধারিতভাবে দেড় পৃষ্ঠার এই চুক্তির সঙ্গে ১৯১৯ সালের বিশাল ভার্সাই চুক্তির তুলনা সামনে নিয়ে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ওই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হয়েছিল।

১৯১৯ সালের সেই চুক্তি ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। তবে চুক্তিতে যুদ্ধের যে বিশাল ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছিল, তা জার্মানিকে ক্ষুব্ধ ও তিক্ত করে তোলে। আর সেটাই মাত্র ২০ বছর পরে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চ তৈরিতে সহায়তা করে।

ইরানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তি অনেক দিক থেকেই আলাদা। তারপরও প্রশ্ন জাগে, এটিও কি একইভাবে ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে? প্রায় তিন সপ্তাহ পরেও ভঙ্গুর হলেও যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে বজায় রয়েছে।

তবে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষ হয়েছে। যুদ্ধের মূল কারণগুলোর কোনোটিও সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আগের মতোই চরম অনিশ্চিত রয়ে গেছে। তবে এরই মধ্যে ইরানে এক গভীর পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

দেশটি এখন তাদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষবিদায় জানাচ্ছে। চার মাসের বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের শুরু হয় এবং তেহরান প্রশাসনের নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে হত্যা করা হয়।

এটি এক বড় ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পুরোনো নেতৃত্ব নতুনদের পথ দেখিয়ে গেছে। নতুন এই নেতৃত্বের হাত ধরে আসছে নতুন কর্মপন্থা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো ইরানের অনেক সাবেক নেতাকে হত্যা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এখন কি তবে তাদের জায়গায় আরও শক্তিশালী ও ভয়ংকর কোনো শত্রু তৈরি হলো?

দাবার ছকে নতুন বিন্যাস

জনস হপকিনস স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য স্টাডিজের অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত যেমনটা ভেবেছি, এই যুদ্ধের পরিণতি তার চেয়ে অনেক বড়।’
ভ্যালি নাসর বলেন, ‘এই মাত্রার সব বড় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দাবার ছক নতুন করে সাজায়। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই কাজ করবে।’

গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়েই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

কয়েক দশক ধরে চলমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিধ্বস্ত ছিল। এর ওপর ছয় মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের একটি যুদ্ধের ক্ষতও দেশটি তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে তাদের সুবিধা আদায়ের একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি এটি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন। কিন্তু তা ধ্বংস না হলেও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুতের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের কাছে যে ইউরেনিয়াম রয়েছে, তা আরও সমৃদ্ধ করা হয়ে থাকলে সেগুলো দিয়ে ১০ থেকে ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। ধারণা করা হচ্ছে, এই মজুতের একটি বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের মিত্র ও অনুসারীদের একটি জোট আছে। এটি ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) নামে পরিচিত। এই জোটও একের পর এক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছিল। সিরিয়ায় ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে তারা ক্ষমতা হারায়।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছে ইসরায়েল। পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের মাধ্যমে তারা হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদেরও ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
গাজা উপত্যকায় ইরানের আরেক মিত্র হামাসও একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস ইসরায়েলে ভয়াবহ হামলা চালায়। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় অবিরাম আক্রমণ শুরু করে। তারা গাজার বিশাল অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার জবাবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তারা লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজেও হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পাল্টা হামলা চালায়। তাদের কোনো কোনো হামলায় গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
দেশে-বিদেশে এমন অনেক বিপর্যয়ের পর সবার মধ্যে এই ধারণা জন্মেছিল যে ইরান এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছিলেন, যেগুলোতে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

ইরান যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে, এমন চিন্তা তখন অবাস্তব মনে হয়েছিল।

অথচ শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনো টিকে আছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা তারা দেখিয়েছে। মূলত এই সক্ষমতাই তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করেন যে তিনি ইরানে শাসকের বদল ঘটিয়েছেন। ভ্যালি নাসর এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন না। তবে তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তন আসলে তেহরানের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে।

ভ্যালি নাসর বলেন, ‘পুরো এক নতুন প্রজন্ম এখন ক্ষমতায়। তাদের একটি খুব স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। তারা যুদ্ধ সামলেছে এবং এখন তারা শান্তিপ্রক্রিয়াও সামলাতে যাচ্ছে।’
নাসর বলেন, ওয়াশিংটন সাধারণত ইরানি নেতাদের ‘একগুঁয়ে আদর্শবাদী’ বলে থাকে। সেখানে নতুন নেতৃত্ব এখন ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়নি। বিপ্লব-পরবর্তী এই নেতারা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অত্যন্ত কঠোর। তাঁরা পূর্বসূরিদের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বয়স ৫৬ বছর। তিনি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। যুদ্ধের শুরুতে যখন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, তখন তিনি শারীরিকভাবে অনেকটা দুর্বল ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ বছর। তবে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া সেই প্রজন্মের কেউই আর এখন ক্ষমতায় নেই।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান কমান্ডার আহমদ ভাহিদি। তাঁদের দুজনেরই বয়স ষাটের কোঠায়।

নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতো তাদের দুজনেরই শক্তিশালী ইরানিয়ান রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। লন্ডনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘তাঁরা বিপ্লবের সন্তান।’

সানাম আরও বলেন, ‘৮৬ বছর বয়সী কোনো বৃদ্ধ এখন আর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জাহাজ চালাচ্ছেন না। আলী খামেনি ছিলেন এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের পথে বড় বাধা।’ অতি সাবধানী আলী খামেনি কয়েক দশক ধরে এমন কৌশল নিয়ে দেশ চালিয়েছেন, যাকে কখনো কখনো ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ বলে মনে হয়েছে।

সেখানে তাঁর উত্তরসূরিরা অনেক বেশি সাহসী। তাঁরা পুরো অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছেন। আবার কয়েক সপ্তাহ পরেই যুদ্ধের ইতি টানতে আলোচনায় বসেছেন। আলোচনার শর্তগুলো তেহরানের জন্য মোটেও অপমানজনক ছিল না। নাসর বলেন, ‘তাঁরা দেখিয়েছেন যে আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে যুদ্ধে জড়াতে রাজি আছেন।’

২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে চালানো বিমান হামলায় রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের তৎকালীন কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। ইরান তখন ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে জানিয়ে বার্তা দিয়েছিল। সে সময় ওই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি।

এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলার মুখে ইরান আর এ ধরনের কোনো সংযম দেখায়নি। তারা ওই অঞ্চলের অনেক মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কাতারের আল-উদাইদ বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়। কুয়েতে ইরানের হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। লড়াই চলাকালে আরও কয়েক শ মার্কিন সেনা আহত হন।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা ও জাহাজে আক্রমণ চালানোর ঝুঁকি নিতেও ইরান পিছপা হয়নি। এমনকি তারা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দেয়। ইরানের এমন সব পদক্ষেপ হোয়াইট হাউসকে অবাক করে দেয় বলেই মনে হয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

এসএ
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.

Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; 01550707297 Advertisement: 41053012; 01550707291, E-mail: [email protected] [email protected]
🔝