⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৭:২২ পিএম

X

বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সময়ে দেশে হামের (মিজলস) প্রাদুর্ভাবও অব্যাহত রয়েছে। একদিকে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বড় ধরনের সংক্রমণের পূর্বাভাস, অন্যদিকে হামে শত শত শিশুর মৃত্যু- এই দুই সংকট একসঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন করে সিলেট ও বরিশাল বিভাগের। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩১ জনে। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছে আরও ৯৩ শিশু। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭২৪।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৬ হাজার ৪১১ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৮২ হাজার ৭৫৯ জন। তবে এখনো বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে কয়েক হাজার শিশু।
অন্যদিকে, ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ জন। মারা গেছেন ১৩ জন। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৫ এবং মৃত্যু হয়েছিল একজনের। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯২৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখনো সামনে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, জুলাই মাসে ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুনের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে। আগস্টে তা তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, রাজধানীর বাইরের অনেক জেলার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।
তিনি বলেন, টানা বর্ষণ, উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথেষ্ট কার্যকর নয়। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সময়ে দুটি বড় সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করা। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজন বাড়তি হাসপাতাল শয্যা, রক্তের উপাদান এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ। অন্যদিকে হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন টিকাদান কার্যক্রম, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। দুটি রোগের চাপ একসঙ্গে বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অধ্যাপক কবিরুল বাশার দেশব্যাপী একটি আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই শনাক্ত করা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনগণকে সতর্ক করা সম্ভব হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় মশা নিধন কার্যক্রম, জমে থাকা পানি অপসারণ, হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বিস্তার এবং একই সময়ে হামের চলমান প্রাদুর্ভাব দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপই আগামী মাসগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
-টিএস