ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
আধুনিকতার ঢেউয়েও টিকে আছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৫ পিএম
X
Advertisement

ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়তেই পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় শোনা যায় এক পরিচিত ছন্দ—টক...টক...টক। ঘোড়ার খুরের সেই ছন্দময় শব্দ যেন মুহূর্তেই ফিরিয়ে নেয় কয়েক দশক আগের ঢাকায়। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা, মোটরযানের কোলাহল আর যানজটের ভিড়ের মাঝেও আজও সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলাচল করে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি, যা স্থানীয়দের কাছে বেশি পরিচিত ‘টমটম’ নামে।

দেশের বহু দুর্গম এলাকায় যেখানে আধুনিক যানবাহনের চলাচল সীমিত, সেখানে ঘোড়ার গাড়ি এখনো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইসঙ্গে রাজধানী ঢাকার পুরান অংশেও শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই বাহন।

ইতিহাসের পথ ধরে টমটম

ঐতিহাসিকদের মতে, মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার ছিল। তখন এটি ছিল শহরের অন্যতম প্রধান গণপরিবহন। একসময় এই বাহন ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। প্রথমদিকে রাজা-বাদশাহ, জমিদার, ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও অভিজাত শ্রেণির মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হলেও পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের হাতেও পৌঁছে যায় ঘোড়ার গাড়ি।

বিয়ে, উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ঘোড়ার গাড়ি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর নাম বদলে স্থানীয়দের মুখে মুখে হয়ে ওঠে ‘টমটম’।

এখনো চলছে সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে

পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও কোচয়ানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কলেজিয়েট স্কুলসংলগ্ন সদরঘাট এলাকা থেকে গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত চলাচল করে টমটম।

প্রতিটি ঘোড়ার গাড়িতে সর্বোচ্চ ১৫ জন যাত্রী বহন করা হয়। জনপ্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। বিশেষ দিন, ছুটির সময় কিংবা উৎসব উপলক্ষে ভাড়া কিছুটা বাড়ে। প্রতিটি গাড়িতে একজন কোচয়ান ও একজন হেলপার থাকেন। কোচয়ান দক্ষতার সঙ্গে ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণ করেন, আর হেলপার যাত্রী ও মালামাল উঠানো-নামানোর দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে প্রতিটি গাড়ি দিনে গড়ে ছয়টি ট্রিপ সম্পন্ন করে। তবে সাপ্তাহিক ছুটি বা যানজট কম থাকলে ৮ থেকে ৯টি ট্রিপও দেওয়া সম্ভব হয়।

কমেছে সংখ্যা, কমেছে যাত্রী

একসময় পুরান ঢাকার রাস্তায় প্রায় ৫০টির মতো ঘোড়ার গাড়ি নিয়মিত চলাচল করত। কিন্তু নগরায়ণ, মোটরচালিত যানবাহনের বিস্তার এবং তীব্র যানজটের কারণে সেই সংখ্যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

আগের মতো আর নিত্যযাত্রীদের ভিড় দেখা যায় না। দ্রুতগতির বাস, রিকশা, সিএনজি ও রাইড শেয়ারিং সেবার যুগে টমটম আর প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম নয়। ফলে অনেক কোচয়ান পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। তবুও যারা এই পেশায় আছেন, তারা বলছেন—এটি শুধু জীবিকা নয়, একটি ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্বও।

ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে ভিড়

বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অভিজ্ঞতার জন্য ঘোড়ার গাড়িতে চড়েন। পুরান ঢাকায় বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে এটি এক বিশেষ আকর্ষণ।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি দর্শনার্থীরাও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভিন্ন স্বাদ উপভোগ করেন। অনেকেই ছবি তোলেন, ভিডিও ধারণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন।

এ ছাড়া বিয়ে, বরযাত্রা, বিজয় শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্রের শুটিং ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজনেও এখনো ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা রয়েছে।

প্রাণীর কল্যাণও গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি ঘোড়াগুলোর স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও জরুরি। নিয়মিত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশ্রাম এবং অতিরিক্ত বোঝা বহন না করানোর বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হলে এই ঐতিহ্য আরও দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।

পর্যটনের সম্ভাবনাও রয়েছে

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়ি রাজধানীর অন্যতম ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। নির্দিষ্ট রুট, নিরাপদ চলাচল, প্রশিক্ষিত কোচয়ান এবং ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।

ইতিহাসের শেষ সাক্ষী

যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে গেছে ঢাকার চেহারা। হারিয়ে গেছে অনেক ঐতিহ্য, অনেক স্মৃতি। কিন্তু এখনো সদরঘাটের পথে ঘোড়ার খুরের টকাটক শব্দ শুনলে মনে হয়—ঢাকার অতীত এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

আধুনিকতার দ্রুতগতির এই শহরে ঘোড়ার গাড়ি আজ শুধু একটি পরিবহন নয়; এটি পুরান ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সময়ের জীবন্ত সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও হয়তো টমটমের সেই চিরচেনা ছন্দে অনুভব করতে পারবে পুরান ঢাকার হারিয়ে যেতে বসা এক অনন্য ঐতিহ্যের স্পন্দন।

আরএন
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement