ঈদের দিন দুপুর গড়াতেই বরিশাল নগরের কীর্তনখোলা নদীতীরের ফলপট্টি ও পোর্ট রোড এলাকায় জমতে থাকে কোরবানির পশুর চামড়া। ভ্যান ও অটোরিকশায় স্তূপ করে রাখা চামড়ার তীব্র গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। চামড়া হাতে অপেক্ষমাণ বিক্রেতাদের মুখে ছিল অস্বস্তি, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার ছাপ। কেউ দর হাঁকছেন, কেউ ফোনে ক্রেতা খুঁজছেন, আবার কেউ দীর্ঘ অপেক্ষার পর কম দামে চামড়া বিক্রি করে হতাশ মনে ফিরে যাচ্ছেন।
বরিশাল নগরের জামিয়াতুল মদিনাতুল মাদ্রাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান খসরু বিকেলের দিকে ৩৯টি বড় গরুর চামড়া নিয়ে আসেন ফলপট্টির অস্থায়ী বাজারে। তিনি বলেন, “দুপুরের দিকে ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে ৪০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করেছি। পরে আরও চামড়া নিয়ে এলে তখন আরও কম দাম বলা হয়। এত কম দামে বিক্রি করে মাদ্রাসার কোনো উপকার হবে না। তবুও বাধ্য হয়ে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।”
বরিশাল সদর উপজেলার কাগাশুরা ও মুকুন্দপট্টি এলাকা থেকে ৫৪টি চামড়া নিয়ে আসা সানাউল্লাহ লাবলু বলেন, “পাইকাররা নির্দিষ্ট কোনো দাম বলছে না। একজন একরকম, আরেকজন আরেকরকম। আসল বাজারদর কোনটা, তা বোঝাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।”
সরকারি দরের বাইরে বাস্তবতা
সরকার এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই দামের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ বিক্রেতাদের। বরিশালে বড় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৩০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ২০০ টাকার মধ্যে। অথচ গত বছর একই ধরনের চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
রহমানিয়া মাহমুদিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মিরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, “গত বছরের তুলনায় প্রতিটি চামড়ায় অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম পেয়েছি। ছাগলের চামড়ার তো কোনো দামই নেই।”
দ্রুত বিক্রি না করলে পচে যাওয়ার শঙ্কা
সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ ও অর্থনীতিবিদ আখতারুজ্জামান খান বলেন, খুচরা বিক্রেতা ও মাদ্রাসাগুলোর অধিকাংশেরই চামড়া সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই। লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জায়গা, শ্রমিক ও অভিজ্ঞতা। ফলে ঈদের দিনই দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। এই সুযোগ নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীচক্র।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে কার্যত কয়েকজন বড় ক্রেতাই দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। বিকল্প কম থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। এক ব্যবসায়ী বলেন, “চামড়া ফেলে রাখার জিনিস নয়। কয়েক ঘণ্টা দেরি হলেই গরমে নষ্ট হতে শুরু করে। এই ভয় দেখিয়ে কম দামে কিনে নেওয়া হচ্ছে।”
লবণের দাম, বকেয়া ও ট্যানারি সংকট
পাইকারি ব্যবসায়ী মাহাদ ইসলাম বলেন, ঢাকার ট্যানারিগুলোর কাছে আগের অনেক টাকা আটকে আছে। একটি চামড়া সংরক্ষণে এখন অন্তত ৩০০ টাকা খরচ হয়। লবণ ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তিনি বলেন, “ঢাকায় বর্গফুট অনুযায়ী দর ঠিক হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই দামে বিক্রি করা যায় না। পুরো বাজারটাই কয়েকটি বড় গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে।”
ব্যবসায়ী পলাশ আহসান জানান, বরিশাল বিভাগে এ বছর প্রায় ৫০ হাজার চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। তবে কম দাম ও সংরক্ষণ সংকটের কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক চামড়াও সংগ্রহ হয়নি।
মাদ্রাসাগুলোর আয়ের বড় উৎসে ধস
কোরবানির পশুর চামড়া বহু বছর ধরে দেশের কওমি ও এতিমখানাভিত্তিক মাদ্রাসাগুলোর অন্যতম অর্থনৈতিক উৎস। কিন্তু টানা কয়েক বছর ধরে দাম পড়ে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমানতগঞ্জ এলাকার একটি মাদ্রাসার পরিচালক শহীদুর রহমান পিন্টু বলেন, “একসময় কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকায় মাদ্রাসার বার্ষিক খরচের বড় একটি অংশ উঠে আসত। এখন মাস চালানোই কঠিন হয়ে গেছে। ছাগলের চামড়া বিনা মূল্যে দিলেও কেউ নিতে চায় না। তাই কয়েক বছর ধরে ছাগলের চামড়া সংগ্রহ বন্ধ রাখা হয়েছে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বরিশালে গত বছর ১ লাখ ২৬ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল। এ বছর ১ লাখ ২৯ হাজার গরুর সরবরাহ ছিল। কতটি কোরবানি হয়েছে, তা কয়েক দিনের মধ্যে জানা যাবে।”
চামড়ার দাম নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। তারাই বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে মূল্য নির্ধারণ করে। যদিও বর্গফুট হিসেবে দর নির্ধারিত হয়, বাস্তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পিস হিসেবে চামড়া সংগ্রহ করেন।
আরআই/আরএন