খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নে অবস্থিত প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক মসজিদকুড় মসজিদ সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতাধীন এই প্রাচীন স্থাপনাটির পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং নকশাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সুন্দরবনসংলগ্ন এই অনন্য প্রত্নসম্পদটি তার জৌলুস হারাচ্ছে।
সম্প্রতি প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কিছুটা সংস্কার করে নামাজ আদায়ের উপযোগী করা হলেও তা অপ্রতুল।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন স্থাপত্যের নাম ‘মসজিদকুড় মসজিদ’। দক্ষিণ বাংলার প্রাচীন ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এই মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনাই নয়, বরং ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী। পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও প্রচারণা বাড়ানো গেলে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
সম্প্রতি মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, নয় গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি চুন-সুরকি ও পাতলা বর্গাকার ইট দিয়ে নির্মিত। প্রায় ৪৫ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত স্থাপনার প্রতিটি পাশের দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৭৬ মিটার, ভেতরের অংশের দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ১৯ মিটার। মসজিদের ভেতরে চারটি ইটের তৈরি স্তম্ভ আছে, প্রতিটি স্তম্ভে দুটি করে পাথর বসানো। এই চার স্তম্ভ মসজিদের ভেতরকে নয়টি সমবর্গক্ষেত্রে ভাগ করেছে, প্রতিটি গম্বুজ দিয়ে আচ্ছাদিত। কিবলামুখী দেয়ালে আছে অর্ধবৃত্তাকার একটি মিহরাব। বড় প্রবেশদ্বার ও অনন্য নির্মাণশৈলী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
মসজিদ প্রাঙ্গণে থাকা একটি পাথরের স্তম্ভে খোদাই করা লেখা কোনো শিলালিপি না থাকায় নির্মাণকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না, তবে স্থাপত্যরীতিতে ষাটগম্বুজ মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় এটি হযরত খানজাহান আলী (রহ.) এর সময় নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে আছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪১৮ থেকে ১৪৩৩ সাল পর্যন্ত বাংলার সুলতান ছিলেন জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ। সে সময় খানজাহান আলী (রহ.) যশোরের মুড়লী পর্যন্ত এসে তাঁর কাফেলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন। তিনি নিজে এক দল নিয়ে বাগেরহাটের দিকে অগ্রসর হন। অন্য দলটি তাঁর সহচর বোরহান খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ ও তাঁর ছেলে ফতে খাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণে সুন্দরবনসংলগ্ন আমাদী এলাকায় চলে আসেন। ধারণা করা হয়- তাঁদের উদ্যোগেই ১৪৪৫ সালের দিকে মসজিদকুঁড় মসজিদ নির্মিত হয়।
স্থানীয়রা বলেন, আমাদের মসজিদকুড় গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদটির নামেই আমাদের মসজিদকুড় গ্রাম। মসজিদটি ৭০০ থেকে ৮০০ বছরের বেশি বয়স হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাদের গ্রামের এই মসজিদটি দেখতে অনেক মানুষ আসেন। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লীরা। রমজান মাসে মুসল্লীদের ইফতারের ব্যবস্থা থাকে। দূর থেকে বহু মানুষ ইফতার করতে এখান আসেন।
আমাদের উপজেলার নাম কেউ না জানলেও আমাদের মসজিদকুড় মসজিদের নাম মানুষ জানে। এটি প্রাচীন মসজিদ। আমরা ছোটবেলায় এই মসজিদে আরবি পড়তে আসতাম। মসজিদটিতে ৯টি গম্বুজ রয়েছে। আগে মানুষরা মানত করতে এখানে এসে হাস, মুরগী, ছাগল ছেড়ে দিতে। সেটি এখন বন্ধ আছে। আমাদের মসজিদকুড় মসজিদটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদী। এভাবে কথা গুলো বলেছেন মসজিদকুড় গ্রামের বাসিন্দা মো. আবু তায়েব সানা।
মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসা মুসল্লী পল্টু সানা বলেন, 'প্রচন্ড গরমেও মসজিদের ভেতরটা ঠান্ডা থাকে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এই মসজিদ দেখতে আসে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন তত্ত্বাবধায়ক আছেন। তিনি মাঝে মধ্যে আসেন।'
মসজিদকুড় মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, 'আমি প্রায় দুই বছরের মতো এই মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। মসজিদটি যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।'
তিনি বলেন, 'কয়েক মাস আগে কিছুটা সংস্কার কাজ করা হয়েছে। ফলে আপাতত নামাজ আদায় করা গেলেও মসজিদটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।'
জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার আইরিন পারভীন বলেন, 'ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ কাজে যে পরিমাণ বরাদ্দ দরকার সেটি আমাদের নেই। চলতি অর্থবছরে স্বল্প বাজেটে মসজিদকুড় মসজিদের সংস্কার করে নামাজ পড়ার উপযোগী করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে বড় বাজেট পেলে আরও সংস্কার করা হবে।'
এসএম/এমএ