পবিত্র রমজান সংযম, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার মাস। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায় প্রতিবছরই এ মাস ঘিরে আরেকটি চিত্র সামনে আসে—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে চাল, ডাল, চিনি, তেল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে ইফতারের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ফলে রমজানের আধ্যাত্মিক প্রশান্তির পরিবর্তে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে আর্থিক চাপ ও উদ্বেগ। নতুন সরকারের কাছে তাই জনমানুষের প্রত্যাশা—রমজানে মূল্যবৃদ্ধি রুখতে কার্যকর, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও আমদানি-নির্ভর অনেক ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—এসব বাস্তবতা থাকলেও রমজান এলেই হঠাৎ করে যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়, তার পেছনে কেবল বৈশ্বিক কারণ দায়ী নয়। বাজারে অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার ও সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজিও বড় ভূমিকা রাখে। চাহিদা বাড়ার আগেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, গুদামে পণ্য আটকে রাখা কিংবা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অযৌক্তিক মুনাফা যোগ করা—এসব প্রবণতা বহুদিনের।
রমজানে চাহিদা কিছুটা বাড়বে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধিকে অজুহাত বানিয়ে বাজার অস্থির করে তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাজার তদারকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কাঠামো থাকা উচিত। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যদি প্রথম থেকেই বাজার ব্যবস্থাপনায় দৃঢ় অবস্থান নেয়, তাহলে জনগণের আস্থা অনেকটাই ফিরে আসবে।
প্রথমত, বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামাতে হবে। নিয়মিত অভিযান, জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা বার্তা পায়—রমজানে বাড়তি মুনাফার সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত রাখা, প্রয়োজনে দ্রুত আমদানির উদ্যোগ এবং বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থায় অযথা জট কমানো জরুরি। রাষ্ট্রীয় বিপণন সংস্থা যেমন ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ–এর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহ বাড়ানো গেলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি সরাসরি উপকৃত হবে এবং খোলা বাজারেও দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে।
তৃতীয়ত, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কোথায় কোন পণ্যের দাম কত, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান কত—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি সহজে চিহ্নিত করা যাবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত প্রতিকার পায়।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশে পেঁয়াজ, ডাল, ভোজ্যতেলবীজ বা চিনি উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে। কৃষকদের প্রণোদনা, সংরক্ষণাগার উন্নয়ন এবং সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব। এছাড়া নৈতিকতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। রমজান কেবল ব্যবসায়িক মৌসুম নয়; এটি আত্মসংযম ও মানবিকতার সময়। ব্যবসায়ীদের মনে রাখতে হবে—অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের লোভে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ানো অনৈতিক। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও স্বপ্রণোদিত হয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার কঠোর হলে যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যবসায়ী মহলের সামাজিক দায়বদ্ধতাও অপরিহার্য।
নতুন সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। রমজানকে সামনে রেখে যদি তারা বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে তা হবে জনগণের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা। কারণ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং মানুষের জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
সবশেষে বলা যায়, রমজানের প্রকৃত চেতনা হলো সংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়। বাজারে যদি দামের আগুন জ্বলে, তবে সেই চেতনা ক্ষুণ্ণ হয়। নতুন সরকারের উচিত কঠোর নজরদারি, কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে রমজানে মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা। জনগণ একটি স্বস্তির রমজান চায়—যেখানে ইফতারের টেবিলে থাকবে প্রশান্তি, উদ্বেগ নয়। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক