মিয়ানমার–বাংলাদেশ সীমান্ত আজ আর কেবল দুটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক বিভাজনরেখা নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি নীরব ও গভীর জাতীয় সংকটের প্রবেশদ্বারে। এই সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন যে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’ এবং অন্যান্য সিনথেটিক মাদক ঢুকছে, তা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয় এটি সরাসরি বাংলাদেশের তরুণ সমাজ, সামাজিক স্থিতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। সীমান্তের ওপারে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত আজ আমাদের সমাজের ভেতরে বিষ ঢেলে দিচ্ছে, যার প্রভাব আগামী প্রজন্মকে বহু বছর বহন করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার ও পার্বত্য বান্দরবান সীমান্ত দিয়েই মাদক প্রবেশের প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কিছুটা বাড়ায় পাচারকারীরা কৌশল বদলেছে। নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম কিংবা দুর্গম পাহাড়ি গিরিপথ এখন নতুন করিডর। একই সঙ্গে সাগরপথে টেকনাফের বাইরেও মহেশখালী ও সোনাদিয়া অঞ্চলে গড়ে উঠছে নতুন ‘ড্রপ পয়েন্ট’। নৌকা বদল, ফিশিং ট্রলারের গোপন কেবিন কিংবা শরণার্থী শিবিরের ভেতরে মাদক লুকিয়ে রাখার মতো পদ্ধতি দেখায় এই চক্র কতটা সংগঠিত এবং কতটা অভিযোজ্য।
বাংলাদেশের মাদক সংকটের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো, এখানে মূল সিন্ডিকেট এখনো অক্ষত। সীমান্তের ওপারে উৎপাদন, সীমান্ত এলাকায় মজুদ এবং পরে দেশের ভেতরে সরবরাহ এই তিন স্তরের নেটওয়ার্কে হাজারো মানুষ জড়িত। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের অভিযোগ বারবার উঠে আসে। ফলে মাঠপর্যায়ে ছোটখাটো কারবারি ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে কোনো কৌশলই কার্যকর হবে না।
এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির সক্রিয় ভূমিকায়। মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ার সুযোগে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের অর্থনীতির জন্য মাদক পাচারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। অস্ত্র কেনা, যোদ্ধা রক্ষা এবং প্রভাব বিস্তারের অর্থ আসে ইয়াবা ও আইস ব্যবসা থেকে। সীমান্ত সুরক্ষা দুর্বল হওয়ায় এই মাদক সহজেই বাংলাদেশমুখী রুটে প্রবেশ করছে।
এখানে রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। এটি যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো এই বিশাল শিবির কাঠামোর ভেতরে অপরাধচক্র সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি। সবাই অপরাধে জড়িত নয়, কিন্তু কিছু নেটওয়ার্ক দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও পরিচয় সংকটকে কাজে লাগিয়ে মাদক পরিবহন ও মজুদের কাজে শরণার্থীদের ব্যবহার করছে। এতে একদিকে শিবিরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ভেঙে পড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে মাদক সমস্যা আর আলাদা কোনো সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সমাধানের প্রথম শর্ত হলো- সীমান্তকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত নিরাপত্তার আওতায় আনা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযান, পাহাড়ি এলাকায় ড্রোন নজরদারি এবং থার্মাল ক্যামেরা ও রাডার ব্যবস্থার বিস্তার জরুরি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ক্যাম্পগুলো অপরাধচক্রের আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে সহায়তা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
সবশেষে, মিয়ানমার–বাংলাদেশ যৌথ সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি বাস্তবতা, কিন্তু তা অজুহাত হতে পারে না। কূটনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক ফোরাম এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সহায়তা নিয়ে সীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই।
মিয়ানমার থেকে আসা মাদক আজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করছে- এটি আর আশঙ্কা নয়, বাস্তবতা। সীমান্তের ওপারের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর টিকে থাকার অর্থনীতি যদি আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করে, তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি ও উন্নয়ন সবই হুমকির মুখে পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল মাদক সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার দৃঢ় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আরএন