যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পর এবার কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। প্রায় দুই বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বিভক্ত সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফল ও পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের মোট আসন ১০০টি। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৫১টি আসন।
নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৫টি আসন। তাঁদের সঙ্গে একই ককাসে থাকা দুই স্বতন্ত্র সদস্যসহ আসন ছিল ৪৭টি।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত সাতটি আসনে জয় পেয়েছে। এতে দলটির আসনসংখ্যা অন্তত ৫৩-তে পৌঁছেছে। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে তারা। তবে কয়েকটি আসনের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের ফলাফল। টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, ওহাইও ও মেইনে রিপাবলিকানদের পরাজিত করে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
সিনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসের এই নিম্নকক্ষে মোট আসন ৪৩৫টি। এবারের নির্বাচনে সব কটি আসনেই ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন।
নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে ২১৮টি আসন ছিল রিপাবলিকানদের, ডেমোক্র্যাটদের ছিল ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য এবং দুটি শূন্য আসনও ছিল।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের অন্তত পাঁচটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনে দলটি সেই লক্ষ্য অতিক্রম করে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ২০টি আসনের ফল ঘোষণার মধ্যে সব কটিতেই জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এই জয়ের ফলে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসের স্পিকার হওয়ার পথও সুগম হয়েছে। নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে তাঁকে স্পিকার নির্বাচিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ৩ জানুয়ারি ২০২৭ নতুন ১২০তম কংগ্রেসের যাত্রা শুরু হওয়ার কথা।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু দুই বছরের মাথায় সেই নিয়ন্ত্রণ হারাতে হলো দলটিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন হিসেবেও ফলাফলটিকে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের ভালো লড়াইয়ের প্রশংসা করেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে জয়ী হতো।
সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের আগামী দুই বছরের শাসনকার্যে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তদন্ত, আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। বিশেষ করে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদন বা আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের হাতে থাকবে।
তবে এই জয়ের ফলে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তাঁর প্রশাসনকে এখন থেকে আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করে এগোতে হবে।
এফএস