মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত পরিসরে সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালানোর কথা জানিয়েছেন মার্কিন এক কর্মকর্তা। এদিকে হামলার পর ইরানের কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
সোমবার (২ নভেম্বর) মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের পক্ষ থেকে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের জবাবে হামলা চালানো হয়। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে জানা গেছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কেশম দ্বীপে পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আধা-সরকারি ফার্স সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বন্দর লেঙ্গেহ শহরেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্বীপটির আকাশে দুটি বিমান উড়তে দেখেছেন বলেও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি সীমিত পরিসরে পরিচালিত হয়েছে। এটি পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর ইঙ্গিত কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভ্যান্সের মতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠন না করার বিষয়ে একটি দৃঢ় ও যাচাইযোগ্য অঙ্গীকার চায় ওয়াশিংটন। এ বিষয়ে সমঝোতা হলে নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ দিচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সপ্তাহান্তে দুই নেতার ফোনালাপে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি।
নতুন করে হামলার বিরোধিতা করছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। তাদের আশঙ্কা, সংঘাত বাড়লে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাও বেড়েছে। গত অক্টোবর মাসে মার্চের পর এই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক তেলবাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
সংঘাতের অবসানে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। গত সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা। আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়ার একটি কাঠামো নিয়ে কথা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনা চলতে থাকায় দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনাও এখনো রয়েছে।
এফএস