চারটি প্লাস্টিকের ড্রাম, তার ওপর বাঁশের পাটাতন। খালের দুই পাড়ে বাঁধা দড়ি ধরে টেনে সেই ভেলায় পার হতে হয় মানুষকে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এটিই তাঁদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। ভেলায় চড়ে স্কুলে যায় শিশুরা, খাল পার হন কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। একটু অসতর্ক হলেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। একটি সেতুর অভাবে এভাবেই ৯ বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের ১০ গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কামারের ছড়া খালের ওপর নির্মিত সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছরেও সেখানে নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে খাল পারাপার হতে হচ্ছে। বর্ষায় পানির গভীরতা বাড়লে বাড়ে আতঙ্ক। অন্যদিকে, বিকল্প পথে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিনই সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে।
সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদিত ধানসহ বিভিন্ন ফসল বাজারে নিতে তাঁদের অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে, নষ্ট হচ্ছে সময়। শেষ পর্যন্ত ফসল বিক্রির লাভের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বাড়তি যাতায়াত ব্যয়ে।
স্থানীয় কৃষক আনসার আলী বলেন, “আমরা সবাই মিলে আবাদ করে খাই। জমির ফসল বেচে সংসার চালাই। এই ব্রিজটা ভেঙে যাওয়ায় আমাদের যে কী কষ্ট হচ্ছে! ধান হাটে নিয়ে যেতে দুই মাইল ঘুরে যেতে হয়। কষ্ট আর খরচ দুটোই অনেক বেশি।”
শুধু কৃষিকাজ কিংবা বাজারে যাতায়াত নয়, সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত। খালের ওপর দিয়ে চলাচলের একমাত্র ভরসা ড্রামের ভেলা। ছোট শিশুদের এভাবে পারাপার করাতে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হয় অভিভাবকদের। অনেকেই সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেরাই খাল পার করে দেন। ছুটির পর আবার গিয়ে সন্তানদের নিয়ে আসেন।
এক শিশুর অভিভাবক খালেদা বেগম বলেন, “এই খাল দিয়ে অনেক পানি যায়। ড্রাম দিয়ে খাল পার হয়ে আমার ছেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। ছোট ছেলে, ভয় লাগে। তাই আমি নিজেই পার করে দিই। আবার ছুটি হলে গিয়ে নিয়ে আসি। ব্রিজটি হলে নিশ্চিন্তে ছেলে স্কুলে যেতে পারত।”
স্থানীয় বাসিন্দা রোস্তম মিয়া বলেন, “এই ড্রাম দিয়ে প্রতিদিন দেড় হাজারের মতো মানুষ খাল পার হন। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও পার হয়। এতগুলো মানুষের কষ্ট এই একখানা ব্রিজের জন্য। ব্রিজটি হলে আমাদের সবার খুব উপকার হতো।”
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, কামারের ছড়া খালের ওপর সেতু না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের বিষয়টি তাঁদের জানা আছে। সেতুটি নির্মিত হলে এলাকার প্রায় ১২ হাজার মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও কৃষকেরা নিরাপদে চলাচল এবং উৎপাদিত ফসল সহজে বাজারজাত করতে পারবেন। জনদুর্ভোগ লাঘবে সেতুটি নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
পিএমএস/ এফএস