পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি, প্রাদেশিক সরকার স্থগিত এবং সেনা মোতায়েনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। স্কুল বন্ধ, ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধ এবং বিভিন্ন সড়কে শিপিং কনটেইনার দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। তবে পরে প্রদেশটির বেশির ভাগ এলাকায় স্কুল খুলে দেওয়া হয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও সচল করা হয়।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমরান খানের সমর্থকদের সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের চলমান দ্বন্দ্বের মধ্যে এ পদক্ষেপ নতুন করে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে প্রদেশের মানুষকে রক্ষা করতেই সংবিধানসম্মতভাবে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার গত রোববার সাংবাদিকদের বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআই সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো প্রমাণ দেননি।
এদিকে, বিক্ষোভ দমনে অভিযান চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রদেশটির পিটিআইয়ের বেশ কয়েকজন নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নিজ শহর খাইবার জেলার বারায় কয়েক ডজন পিটিআই সমর্থক বিক্ষোভ করেন। সেখানে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার খবরও পাওয়া গেছে।
জরুরি অবস্থা জারির পেছনে রাজনৈতিক কারণ?
গত এক সপ্তাহ ধরে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় মিছিল, সমাবেশ ও পদযাত্রা করেছেন তাঁর হাজার হাজার সমর্থক। প্রদেশটিতে পিটিআই প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা জারির সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পর্যবেক্ষকেরা।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখের মতে, সরকারের পদক্ষেপের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফা নূরও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জরুরি অবস্থা জারির সরাসরি যোগসূত্র দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, বিরোধী দলের নেতৃত্বাধীন সরকারকে মেনে নিতে অনীহাও এ সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির অবস্থান নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পিটিআইয়ের দাবি, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সরকারের ভাষ্য, তিনি সুরক্ষামূলক হেফাজতে রয়েছেন।
পিটিআইয়ের পদযাত্রা শুরুর আগেও দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। গত সেপ্টেম্বরে ইমরান খানের তিন বোনকে সমর্থকদের সংগঠিত করা ও অন্যান্য অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁরা তখন থেকে আটক রয়েছেন।
কারাগারে ইমরান, সমর্থকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ
গত এক বছরে পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরান খানের সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত ছিল। গত আগস্টে তাঁর দুই বোন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর তাঁকে হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে নেওয়া হলে আরেক বোনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পরে তাঁকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।
পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধের জেরে ইমরান খান ক্ষমতা হারিয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। একাধিক দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলেও এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন তিনি।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিটিআইয়ের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। তাঁর ধারণা, সরকার দলটিকে কঠোর বার্তা দিতে এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরির প্রচেষ্টা কঠিন করে তুলতে চাইছে।
সরকারের দাবি, জরুরি অবস্থা জারির পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য নেই। তথ্যমন্ত্রী তারার বলেছেন, পিটিআই চাইলে তাদের মিছিল ও পদযাত্রা চালিয়ে যেতে পারত। সিদ্ধান্তের আগে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সমালোচকদের মতে, সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেনের মতে, পাকিস্তানে ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমেই সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন সংকট
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি পাকিস্তানকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ। দেশটিতে জঙ্গি সহিংসতা বাড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬’-এ সন্ত্রাসবাদের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে পাকিস্তান শীর্ষে ছিল।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে পাকিস্তান একাধিকবার দেশটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ভারতের সঙ্গেও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে, যা নতুন করে সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
এ ছাড়া, হুতিদের বিরুদ্ধে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবকে হামলা থেকে আত্মরক্ষায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান। এমন পরিস্থিতিতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি ও প্রাদেশিক সরকার স্থগিতের সিদ্ধান্ত নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
কুগেলম্যানের আশঙ্কা, এ পদক্ষেপের ফলে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়লে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাঁর মতে, এটি হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাহিদ হুসেনও সিদ্ধান্তটিকে বেপরোয়া বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হতে পারে।
অন্যদিকে, ফারজানা শেখ সতর্ক করেছেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে আরও সক্রিয় সামরিক অভিযান চালানো হলে সেনাসদস্যদের হতাহতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও প্রশ্ন উঠতে পারে।
রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা
পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে একটি প্রদেশের নির্বাচিত সরকার স্থগিত করার সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিক আরিফা নূরের মতে, কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআই—দুই পক্ষই বর্তমান পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে কিছুটা সচেতন। তাঁর ধারণা, বিক্ষোভের মাধ্যমে ইমরান খানকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না—এ বিষয়টিও পিটিআইয়ের একাংশ বুঝতে পারছে।
তবে দুই পক্ষের অবস্থান অনড় থাকলে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ আরও সংকুচিত হতে পারে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে নেওয়া পদক্ষেপ যদি জনমনে ক্ষোভ বাড়ায়, তাহলে খাইবার পাখতুনখোয়ার সংকট পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে আরও গভীর করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি