মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়ার অভিষেক সংবাদ সম্মেলনটা মোটেও মসৃণ হলো না।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রথম ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বারবার অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন তিনি। মাত্র সাড়ে পাঁচ মিনিট প্রশ্নোত্তর পর্ব চালিয়েই শেষ করতে চান সংবাদ সম্মেলন। এতে সাংবাদিকদের মধ্যে তৈরি হয় বিস্ময় ও অসন্তোষ।
ব্রিফিংয়ের শুরুতে ট্রাম্পের আস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান জাকারিয়া। বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছেন। এরপর প্রায় আট মিনিট ধরে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান ৪১ বছর বয়সী এই মুখপাত্র। মাঝেমধ্যে ক্যামেরার দিকে তাকালেও বক্তব্যে ছিল স্ক্রিপ্টের ওপর নির্ভরতা।
এরপর প্রশ্ন নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাত্র তিনজন সাংবাদিককে সুযোগ দেন তিনি। তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করা সংবাদমাধ্যম ছিল ব্রেইটবার্ট, ফক্স নিউজ ও ডেইলি মেইল।
ইউক্রেন প্রশ্নে উত্তর নেই
সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি ছিল, ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করেছে কি না যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন আলোচনার অচলাবস্থা তখন আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি জাকারিয়া।
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পরে আপনাদের জানাতে হবে।’
নতুন দায়িত্বের সঙ্গে স্বামী ও চার সন্তানকে কীভাবে সামলাবেন, এমন প্রশ্নও করা হয় তাঁকে। প্রতিবেদনে এ ধরনের প্রশ্ন নারী ও পুরুষ মুখপাত্রের ক্ষেত্রে সমানভাবে করা হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
উত্তর দিতে গিয়ে নিজের কথায় ভুল করে প্রেসিডেন্টের বদলে স্বামীর কথা বলে ফেলেন জাকারিয়া। পরে হেসে ভুল শুধরে বলেন, ‘আমার প্রেসিডেন্ট দুঃখিত, আমার স্বামী।’
গ্রিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে পদত্যাগের নির্দেশ
প্রথম ব্রিফিংয়ে অবশ্য একটি বড় খবর দেন জাকারিয়া। গ্রিসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বার্লি গিলফয়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
ঘোষণার পর সাংবাদিকেরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলেও ব্রিফিং শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন জাকারিয়া। প্রেসিডেন্টের যাত্রার সময় হয়ে আসছে জানিয়ে তিনি আর প্রশ্ন নিতে চাননি।
সাংবাদিকেরা আরও প্রশ্ন করার অনুরোধ জানান। কেউ জানতে চান, ট্রাম্প গিলফয়েলের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না। অন্যরা প্রশ্ন করেন, রাশিয়ার ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে কি না।
জাকারিয়া জানান, মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারে ওঠার সময় প্রেসিডেন্ট এসব প্রশ্নের উত্তর দেবেন। তবে নতুন মুখপাত্রের সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্নই অনুত্তরিত থেকে যায়।
কারোলিন লেভিটের সঙ্গে তুলনা
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক মুখপাত্র কারোলিন লেভিট ছিলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয়ের অংশ। নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা লেভিটকে প্রেসিডেন্টের অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে দায়িত্ব নিয়ে লেভিট হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী প্রেস সেক্রেটারি হন। সাংবাদিকদের কঠিন প্রশ্নের মুখেও তিনি ছিলেন দৃঢ়। বিপরীতে, জাকারিয়া ট্রাম্পের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের অনেক কর্মকর্তার কাছেও নতুন মুখ।
এর আগে ফক্স নিউজে রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করতেন জাকারিয়া। কিন্তু প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব কেবল টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করা নয়; প্রশাসনের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের যথার্থতা তুলে ধরাও এ পদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আইনজীবী পরিচয় নিয়ে অস্পষ্টতা
প্রথম ব্রিফিংয়ের পর ট্রাম্পের সঙ্গে দক্ষিণ লনে যান জাকারিয়া। সেখানে ইরান, ইউক্রেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং গিলফয়েলের রাষ্ট্রদূত পদ ছাড়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন প্রেসিডেন্ট।
জাকারিয়ার প্রথম সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তাঁর ভালোই হয়েছে।
তবে জাকারিয়ার আইনজীবী পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। গত সপ্তাহে তাঁর নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প তাঁকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এক সাংবাদিক জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্রের কোন অঙ্গরাজ্যে তিনি আইনজীবী হিসেবে সনদ পেয়েছেন।
প্রশ্ন শুনে ট্রাম্প জাকারিয়ার দিকে তাকান। এগিয়ে এসে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি যখন চীনে গিয়েছিলাম।’
তবে এই উত্তরে বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। পরে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তিনি কোথায় আইনজীবী হিসেবে সনদ পেয়েছেন, কিংবা আদৌ কোনো অঙ্গরাজ্যে এমন সনদ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চেউং অবশ্য জাকারিয়ার প্রশংসা করেছেন। ই-মেইলে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, জাকারিয়া প্রশাসনের জন্য দারুণ সংযোজন। আমেরিকানদের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে তিনি বিশেষভাবে যোগ্য ও অত্যন্ত মেধাবী বলেও মন্তব্য করেন চেউং।
দিনের শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে হেলিকপ্টারের দিকে এগিয়ে যান। জাকারিয়া তখন একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাংবাদিকেরা তাঁকে ডাকলেও তিনি শুধু হাসেন, সামনে তাকিয়ে থাকেন। পরে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস এবং প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে মেরিন ওয়ানে ওঠেন তিনি। তাঁদের গন্তব্য ছিল আলাস্কা, এরপর লাস ভেগাস।
প্রথম সংবাদ সম্মেলনে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার পর নতুন সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রেস সেক্রেটারির কঠিন দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ অবশ্য সামনে রয়েছে জাকারিয়ার। তবে তাঁর প্রথম ব্রিফিং সাংবাদিকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর রয়ে গেছে অধরা।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস / এফএস