দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানাগুলো আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গাজীপুরের কাশিমপুরে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের একটি পোশাক কারখানা নতুন ব্যবসায়িক কাঠামোয় চালু করতে ব্রিটিশ ও চীনা দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী বছরের এপ্রিল থেকে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বন্ধ ১৬টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার একটি প্রিফিক্স ফ্যাশনস লিমিটেড প্রথমে চালু করা হবে। এতে বিনিয়োগ করবে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান চার্টার এইচসিপি লিমিটেড এবং চীনা প্রতিষ্ঠান বেস্টিং লিমিটেড। বিনিয়োগকারীদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল গ্লোবাল।
পাঁচ বছরের ইজারা, রপ্তানি আয় থেকে ঋণ পরিশোধ
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেক্সিমকোর সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি ইজারা বা চুক্তিতে যাবে। এই মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কারখানার রপ্তানি আয় সরাসরি ঋণদাতা ব্যাংকের হিসাবে যাবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক রপ্তানি আয় থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণের কিস্তি কেটে নেবে।
ফলে ঋণ পরিশোধের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বেক্সিমকোর সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকবে না। উদ্যোক্তাদের ধারণা, এতে একদিকে কারখানায় উৎপাদন ও রপ্তানি চালু হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের একটি নিয়মিত ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে।
এ প্রস্তাব নিয়ে আগামী ১১ অক্টোবর সরকারি বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেক্সিমকো ও রিভাইভাল গ্লোবালের কর্মকর্তাদের বৈঠকের কথা রয়েছে। প্রস্তাবিত ইজারা বা মুনাফা ভাগাভাগির কাঠামো বাস্তবায়নে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
জ্যাকেট হবে প্রধান পণ্য
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কারখানাটি চালু হলে মূলত রপ্তানিমুখী পোশাক উৎপাদন করা হবে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ হবে জ্যাকেট, বাকি ১০ শতাংশ অন্যান্য পোশাক।
প্রথম পর্যায়ে কারখানাটিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, উৎপাদন পুরোপুরি কার্যকর হলে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে কারখানাটি থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
চীনা প্রতিষ্ঠান বেস্টিংয়ের আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে কার্যাদেশ ও ক্রেতা সংগ্রহের অভিজ্ঞতা কারখানাটির রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রিফিক্স ফ্যাশনস শুরু থেকেই বেস্টিংয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়ে আসছে।
সফল হলে খুলবে আরও ১৫ কারখানা
প্রথম কারখানা চালুর উদ্যোগ সফল হলে একই ব্যবসায়িক মডেলে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বাকি ১৫টি বন্ধ কারখানাও পর্যায়ক্রমে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বেক্সিমকোর কর্মকর্তাদের হিসাবে, শিল্পপার্কের কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পর ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। নতুন মডেলে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে তাঁদের একটি বড় অংশের আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের রিভাইভাল গ্লোবাল এর আগেও বেক্সিমকোর বন্ধ পোশাক কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগে যুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইকোমিলির সঙ্গে ২ কোটি ডলারের বিনিয়োগে ইজারা চুক্তির প্রক্রিয়াতেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে।
ঋণের বোঝা বড় চ্যালেঞ্জ
কারখানা চালুর এই উদ্যোগের পেছনে বেক্সিমকোর বিশাল ব্যাংক ঋণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ৩২টি কারখানার বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কাছেই বেক্সিমকোর পাওনা প্রায় ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। ফলে বন্ধ কারখানা চালু করে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ পরিশোধের একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বন্ধ হওয়ার পর শ্রমিক সংকট
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেক্সিমকোর কয়েকটি কারখানায় অস্থিরতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের মার্চে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে সরকার ৫২৬ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছিল।
কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও বন্ধ হয়ে যায়। এখন একটি কারখানা দিয়ে নতুন মডেলের যাত্রা শুরু হলে সেটি শুধু বেক্সিমকোর জন্য নয়, ব্যাংক ঋণ আদায়, রপ্তানি আয় ও শ্রমিক কর্মসংস্থান তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
ইআরএফের সাধারণ সম্পাদকও মনে করছেন, ব্রিটিশ ও চীনা প্রতিষ্ঠানের ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগে কারখানা চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে গতি আসতে পারে।
তবে প্রস্তাবটি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়। ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, রিভাইভাল গ্লোবালের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা শেষে সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দিতে পারবে। ফলে বেক্সিমকোর প্রথম কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ বাস্তবে কতটা দ্রুত এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এফএস