চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আগামী ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’। কোম্পানিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ উভয় পক্ষ ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর প্রধান চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি হলো সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এই টার্মিনালের মাধ্যমে রেকর্ড প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক (টিইইউস) কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে নতুন করে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত ‘চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড’ টার্মিনালটির পরিচালন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের অন্য তিনটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক চেইন অপারেটর ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল’ (আরএসজিটিআই)। ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনসিটি পরিচালনায় নতুন সম্ভাবনা, আসছে ১৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোয় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ায় টার্মিনালটির সক্ষমতা, পরিচালন দক্ষতা ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৫ বছরের এই কনসেশনের আওতায় আন্তর্জাতিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। এ সময়ে টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ব্যবস্থায় এনসিটির জমি, মূল অবকাঠামো ও সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কাছেই থাকবে। নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে কনসেশনগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান। মেয়াদ শেষে টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বন্দর খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক অপারেটরের দক্ষতা ও প্রযুক্তি কাজে লাগানো গেলে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। তবে এর সুফল অনেকটাই নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত, কর্মদক্ষতার সূচক এবং কার্যকর তদারকি কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
বিনিয়োগ ও রাজস্বে ইতিবাচক প্রভাব
প্রস্তাবিত কাঠামোয় এনসিটির যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও পরিচালনার আর্থিক দায়িত্ব কনসেশনগ্রহীতা অপারেটরের ওপর থাকবে। টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতেও বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে কনসেশনের মেয়াদের মধ্যে এসব খাতে সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিনিয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) হিসেবে আসবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার মতে, অপারেটর নিজস্ব বিনিয়োগে টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিলে বন্দরের আর্থিক চাপ কমবে। চুক্তিতে নির্ধারিত কর্মদক্ষতার সূচক অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা গেলে এর সুফল পরিচালন দক্ষতায়ও প্রতিফলিত হবে।
এনসিটির কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়লে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। চুক্তি অনুযায়ী এখানে রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি টিইইউ কনটেইনারের বিপরীতে টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্বের একটি অংশ পাবে। এই কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ থেকে ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি বা রাজস্বের অংশ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। টার্মিনালের গড় আয় বাড়লে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্বের অংশও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামোর কারণে টার্মিনালের কার্যক্রম ও আয় বাড়লে তার একটি অংশ বন্দরের রাজস্ব হিসেবেও প্রতিফলিত হবে। ফলে সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধির একটি সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
কমবে জাহাজ ও পণ্য খালাসের সময়
আধুনিক টার্মিনাল পরিচালন ব্যবস্থা, উন্নত ক্রেন ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পরিচালন পদ্ধতি চালু হলে জাহাজের বন্দরে অবস্থানের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে টার্মিনালে কনটেইনারের অবস্থানকাল কমলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয়ও কমে যাবে।
নির্ধারিত কর্মদক্ষতার সূচকের আওতায় ধীরে ধীরে ট্রাকের ঘুরে আসার সময় ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কাগজবিহীন (পেপারলেস) কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের মতে, পণ্য খালাসে সময় কমানো গেলে শুধু আমদানি-রপ্তানিকারকরাই নন, পুরো সরবরাহব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে সময়নির্ভর রপ্তানি খাতের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য বন্দরসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ
এনসিটির বর্তমান কর্মীদের নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্পূর্ণ সুযোগ রাখা হয়েছে। বিদ্যমান কর্মীদের পর্যায়ক্রমে নতুন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আধুনিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে কর্মসংস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। কনসেশনের মেয়াদ শেষে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পরিচালন জ্ঞান বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থাও থাকছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নিজস্ব বন্দর পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
অক্ষুণ্ন থাকছে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও তদারকি
আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলেও এনসিটির সম্পদ ও অবকাঠামোর মূল মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমেই পরিচালিত হবে।
অপারেটরের কার্যক্রম তদারকিতে কর্মদক্ষতার সূচক, নিয়মিত প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, নজরদারি ও চুক্তিভিত্তিক জবাবদিহিতার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কার্যকর তদারকির মাধ্যমে পরিচালন দক্ষতার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সামগ্রিক লজিস্টিকস খাতে নতুন গতি
এনসিটির সক্ষমতা বাড়লে এর ইতিবাচক প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যবস্থায় পড়বে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম পরিবহন করিডোর, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো, শীতল সরবরাহব্যবস্থা (কোল্ড চেইন) ও শিল্পপার্কে বিনিয়োগ বাড়ার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
লজিস্টিকস খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বন্দরের দক্ষতা শুধু জাহাজ ও কনটেইনার খালাসের ওপর নির্ভর করে না। বন্দর, সড়ক, রেল, অভ্যন্তরীণ ডিপো ও অন্যান্য লজিস্টিকস অবকাঠামোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ ভবিষ্যৎ বন্দর প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এনসিটির এই অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখবে। দ্রুত পণ্য খালাস, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা ও কম লজিস্টিকস ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পিপিপি (Public-Private Partnership) কর্মসূচির জন্যও একটি বড় মাইলফলক। এই প্রকল্পের লেনদেনবিষয়ক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থ কর্পোরেশন (আইএফসি)। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বড় বন্দর অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগ সফলভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য অবকাঠামো খাতেও পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।
চুক্তির শর্তাবলি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এনসিটির এই পিপিপি কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে দেশের বন্দর পরিচালন দক্ষতা, রাজস্ব আয় ও সার্বিক লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এসএ