নওগাঁর মান্দায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে তীব্র জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা। ২১৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১১ জন। শূন্য রয়েছে ১০৪টি পদ।
চিকিৎসক, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, পরিবার কল্যাণ সহকারী, মিডওয়াইফ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তাপ্রহরী ও আয়া পদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকায় বিশেষ করে গর্ভবতী মা, নারী ও শিশুরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
মান্দা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অধীনে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ১৫৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮৩ জন। শূন্য রয়েছে ৭৫টি পদ।
অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অধীনে রয়েছে নয়টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে অনুমোদিত ৫৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৮ জন। শূন্য রয়েছে ২৯টি পদ।
দুই ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্র মিলিয়ে ২১৫টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১১১ জন। অর্থাৎ মোট শূন্য পদের সংখ্যা ১০৪।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মীকে একাধিক কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের একাধিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনবল সংকটের পাশাপাশি রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যাও। প্রয়োজনীয় জনবল ও নিয়মিত তদারকির অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
এর মধ্যে কশব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ভবনটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। দ্বিতীয় তলার কক্ষগুলোতে জমেছে ময়লার স্তূপ। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অধীনে থাকা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশেরই নিজস্ব ভবন নেই। কয়েকটি কেন্দ্র পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অধীনে থাকা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের কক্ষ ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। এতে জায়গার সংকটের পাশাপাশি সেবাদান কার্যক্রমেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী পাওয়া যায় না। আবার কর্মরতদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকায় রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন।
পাঁচ মাস ধরে ওষুধ সংকট
জনবল সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ওষুধের ঘাটতি। স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে প্রায় পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নেই। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কশব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ওষুধ নিতে আসা এক সেবাগ্রহীতা বলেন, “সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কম খরচে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার আশায় আমরা আসি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ না পেলে বাড়ির কাছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কী লাভ?”
মৈনম ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে আসা মৈনম গ্রামের সেবাগ্রহীতা মুনসুর আলী মীর ও রিপা রানী বলেন, “আমরা এখানে ওষুধ নিতে আসি। অনেক সময় কিছু ওষুধ পাওয়া যায় না। এখানে মাত্র দুজন কর্মরত আছেন। আরও জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে আমরা মানসম্মত সেবা পাব।”
কশব ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিস সহায়ক উত্তম কুমার বলেন, “আমাদের এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চাপ অনেক বেশি। কিন্তু আমরা মাত্র দুজন কর্মরত আছি। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে একজন ভিজিটর কর্মরত রয়েছেন।”
মৈনম উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মো. ফয়েজ উদ্দিন বলেন, “আমাদের এই উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান সমস্যা অবকাঠামো। নিজস্ব ভবন নেই। মৈনম ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের একটি কক্ষ ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি জনবল সংকটও রয়েছে। অনুমোদিত পাঁচটি পদের বিপরীতে মাত্র দুজন কর্মরত আছেন।”
প্রসাদপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কর্মরত ফার্মাসিস্ট ও আয়া বসে আছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় পাঁচ মাস ধরে কেন্দ্রে কোনো ওষুধ নেই। সেখানে অনুমোদিত পাঁচটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন।
গণেশপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা মরিয়ম খাতুন বলেন, “এই কেন্দ্রে জনবল ও ওষুধ—দুই সংকটই রয়েছে। এর ওপর আমাকে প্রসাদপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।”
নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ, জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার এবং যেসব উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব ভবন নেই, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। এতে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী মা, নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ হাতের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।
এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খোন্দকার মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, “শূন্য পদগুলোর চাহিদাপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।”
মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুব-উল আলম বলেন, সরকারি প্রাপ্যতা অনুযায়ী উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওষুধ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু বিষয়গুলোতে দৃষ্টিপাত করেছেন এবং সংসদে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ করছে। অবকাঠামোগুলো নতুন করে নির্মাণ হলে জনবল নিয়োগের বিষয়টিও সুরাহা হবে এবং মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”