দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্য, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের একটি অংশ দলীয় পরিচয় হারানোর পরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কেউ চাঁদাবাজি, কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, আবার কেউ দলীয় পরিচয় ও পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন অনেকে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অমান্য, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান, অনুমোদন ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, দখল-চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে দলীয় পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাউকে বহিষ্কার, কাউকে পদ থেকে অব্যাহতি এবং কোথাও কোথাও পুরো কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।
তবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বহিষ্কৃতদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড থামছে না। স্থানীয় পর্যায়ে অনুসারীদের নিয়ে তৎপরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া এবং নিজেদের সাবেক দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
বেপরোয়া বহিষ্কৃতরা
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে বহিষ্কৃত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
গত ১ অক্টোবর বাংলামোটর এলাকার নিউ ইস্কাটনে একটি বাসার সামনে ব্যবসায়ী সোহানের পথরোধ করার অভিযোগ ওঠে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওই ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাইমন পিস্তল বের করে ব্যবসায়ীর বুকের দিকে তাক করেন এবং গুলি করার চেষ্টা করেন। পরে পিস্তলের বাঁট দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় স্থানীয় লোকজন উত্তেজিত হয়ে সাইমনকে ঘিরে ফেলেন এবং তাঁর মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও এসআরবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সাইমনসহ তাঁর তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে হাতিরঝিল থানা যুবদলের আহ্বায়কের পদ থেকে সাইমনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
এর আগে গত ২৮ অক্টোবর সেনাবাহিনী ও র্যাবের (এসআরবি) সদস্য পরিচয়ে একটি বাসায় ঢুকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মামলায় মোহাম্মদপুর থেকে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা বিএম ইব্রাহিম ওরফে তালা ইব্রাহিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ৭ নম্বর সড়কে ব্যবসায়ী জাহিদ হাসানের বাসায় তালা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল প্রবেশ করে। তারা নিজেদের সেনাবাহিনী ও র্যাবের সদস্য পরিচয় দেয়। সাদা পোশাকে থাকা ওই ব্যক্তিদের হাতে ওয়াকিটকিও ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। পরে বাসার লোকজনকে জিম্মি ও মারধর করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নানা অভিযোগের কারণে তাঁকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে বিলুপ্ত করা হয় ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কমিটিও।
শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করে চাঁদার অভিযোগ
মোহাম্মদপুর এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন রিপনের বিরুদ্ধেও। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বসিলা এলাকার ব্যবসায়ী তারেক আজিজের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ নিয়ে কয়েক দফা ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে গত ৪ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে খিলক্ষেত থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর প্রার্থী শাহিনুর আলম মারফতকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি। পরে তাঁকে খিলক্ষেত থানায় সোপর্দ করা হয়।
এর পরদিন, ৫ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি।
পুলিশের ভাষ্য, শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় স্বপনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ছয়তলা গার্মেন্টস থেকে চাঁদাবাজি, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট পরিচালনা, আগারগাঁও নতুন রাস্তা এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি এবং শেরেবাংলা নগর থানার পাশের সমবায় বস্তিতে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কার ১১
গত ২৪ অক্টোবর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে নির্দেশ অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
এ ঘটনার পর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল এবং পশ্চিম শাখা ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। একই ঘটনায় তিন সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া বহিষ্কৃত যুবদল নেতা নূর আলমসহ যুবদল ও ছাত্রদলের ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, এসব ঘটনায় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান স্পষ্ট—দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস কিংবা জনবিরোধী কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে বহিষ্কার বা পদচ্যুত করার পরও কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় দলের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
‘অপকর্মকারীদের জন্য বিএনপির দরজা আজীবনের জন্য বন্ধ’
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ডেইলি অবজারভারকে বলেন, ‘যারা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল, তাদের ইতিমধ্যে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যারা এখনও শুধরায়নি, তাদের জন্য বিএনপির দরজা আজীবনের জন্য বন্ধ। এরপরও বেপরোয়া কার্যকলাপ অব্যাহত থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ডেইলি অবজারভারকে বলেন, ‘যেখানে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেখানে এসব অপকর্মে যারা লিপ্ত, তারা বিএনপির কেউ নয়। যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সাংগঠনিক শৃঙ্খলাই বড় চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বড় রাজনৈতিক দলের জন্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নেতা বহিষ্কৃত হওয়ার পরও যদি পুরোনো দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মাঠে সক্রিয় থাকেন, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দলের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসের মতো অভিযোগে বহিষ্কৃত নেতাদের নাম জড়ালে, তার দায় দলকে না নেওয়ার অবস্থান যতটা স্পষ্টভাবে প্রচার করা হবে, ততই সাংগঠনিকভাবে স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশও মনে করছেন, দল থেকে বহিষ্কারের পর কেউ যদি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালান, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অবস্থান আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বহিষ্কৃতদের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান সম্পর্কে নিয়মিতভাবে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অবহিত করার দাবি রয়েছে।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, বিএনপিতে ব্যক্তি নয়, দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কেউ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বহিষ্কৃত বা পদচ্যুত কোনো ব্যক্তি পরবর্তীতে কোনো অপকর্মে জড়ালে তার দায় বিএনপি নেবে না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় ঐক্য ধরে রাখার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বহিষ্কৃতদের রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সাংগঠনিক অবস্থান আরও কঠোর ও স্পষ্ট করা না গেলে ভবিষ্যতে তা দলের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
আরএন