আজও ঘরের শোকেসে সাজানো আবরার ফাহাদের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও ব্যবহার করা নানা জিনিসপত্র। পড়ার টেবিলটি আছে আগের মতোই, পরিপাটি বিছানাটিও। শুধু নেই সেই মেধাবী তরুণ। সন্তান হারানোর সাত বছর পরও তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে দিন কাটছে কুষ্টিয়ার পিটিআই সড়কের বাড়িটিতে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল ৭ অক্টোবর। ২০১৯ সালের এই দিনে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে প্রাণ হারান আবরার। নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন আবরারের পরিবার ও কুষ্টিয়াবাসী।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে বাসে ওঠার আগে ছেলেকে নিজ হাতে খাইয়ে বিদায় দিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। স্বাভাবিক আর দশটি দিনের মতোই ছিল সেই বিদায়। কে জানত, সেটিই হবে মায়ের সঙ্গে আবরারের শেষ দেখা। পরদিন ভোরে সন্তানের মৃত্যুর খবর পেয়ে যে শোক নেমে আসে পরিবারে, সাত বছর পরও তা কাটেনি।
আবরারের ঘরে ঢুকলেই যেন ফিরে আসে পুরোনো স্মৃতি। শোকেসে রাখা তাঁর ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন, পড়ার টেবিল, বই-খাতা ও অন্যান্য সামগ্রী আজও পরিবারের কাছে অমূল্য স্মৃতি। এসব জিনিসের মধ্যেই সন্তানকে খুঁজে ফেরেন মা রোকেয়া খাতুন ও বাবা মো. বরকত উল্লাহ।
সন্তান হত্যার বিচার কার্যকরের অপেক্ষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর কেটে গেল, অথচ এখনো পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা হয়নি। যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য আবরার শহীদ হয়েছে, সেই স্বপ্নের রাষ্ট্র গঠনের পাশাপাশি আমরা আসামিদের দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর দেখতে চাই।’
নাতি হত্যার বিচার কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন আবরারের ১০৫ বছর বয়সী দাদা আব্দুল গফুর। তাঁর কণ্ঠেও একই আকুতি। তিনি বলেন, ‘বাঁচতে বাঁচতেই যেন আবরার ফাহাদের ঘাতকদের শাস্তি কার্যকর দেখে যেতে পারি।’
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আবরারের মা রোকেয়া খাতুন বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তিনি আবরারের একমাত্র ছোট ভাই, বুয়েটের যন্ত্রকৌশল (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাইয়াজের সঙ্গে ঢাকায় বসবাস করছেন।
আবরারের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাই ফাইয়াজও বুয়েটে ভর্তি হন। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হয়ে ভাইয়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন ও স্মৃতি বহন করে এগিয়ে চলেছেন তিনি। আর কুষ্টিয়ার বাড়িতে পড়ে আছে বড় ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্নগুলো।
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ঘটে যাওয়া আবরার হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি সাত বছর পরও তাড়িয়ে বেড়ায় কুষ্টিয়াবাসীকে। স্থানীয়ভাবে আবরারের স্মৃতি ধরে রাখতে গড়ে ওঠা শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি গ্রন্থাগারের উপদেষ্টা সুলতান মারুফ তালহাসহ স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।
আবরার ফাহাদ হয়তো লাখো মানুষের ভালোবাসা, প্রতিবাদ ও স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। কিন্তু সন্তান হারানোর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে রোকেয়া খাতুন ও বরকত উল্লাহর জীবনে, সাত বছরেও সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি। বরং প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকী তাঁদের কাছে ফিরিয়ে আনে সেই শেষ বিদায়ের দিনটি—যেদিন মা নিজ হাতে খাইয়ে ছেলেকে বাসে তুলে দিয়েছিলেন, অথচ জানতেন না, সেটিই হবে তাঁদের শেষ দেখা।