নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্থিরতায় কিছুতেই স্বস্তি মিলছে না সাধারণ ক্রেতাদের। চাল, ডাল ও সবজির চড়া দামের চাপের মধ্যে নতুন করে চরম ভোগান্তি বাড়িয়েছে সয়াবিন তেল ও চিনির তীব্র সরবরাহ সংকট। সরকারের নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) তোয়াক্কা না করে বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত—উভয় পণ্যই বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যে আটকে রয়েছে ডিম ও সাধারণ সবজির দাম। ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার করতে এসে ক্ষোভ ও নাজেহাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষকে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর কাপ্তানবাজার, রামপুরা, হাজীপাড়া, মালিবাগ, সেগুনবাগিচা, মগবাজার, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের এই চড়া ও অস্থিতিশীল চিত্র দেখা গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাড়া-মহল্লার বেশিরভাগ দোকানে প্যাকেটজাত ১ কেজি চিনির নির্ধারিত খুচরা মূল্য ১১০ টাকা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। বহু দোকানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ‘চিনি নেই’ লেখা অদৃশ্য ব্যানার। আবার অনেক বিক্রেতা ক্রেতাদের প্রশ্নের মুখে এড়াতে প্যাকেটের মুখ কেটে খোলা চিনি হিসেবে ১২০ টাকায় বিক্রি করছেন।
হাজীপাড়ার মুদি দোকানি শাহজাহান মিয়া জানান, চিনির প্যাকেটের গায়ে ১১০ টাকা লেখা থাকলেও পাইকারি বাজার থেকে তাদের কিনতে হচ্ছে ১১৩ টাকায়। ফলে বাধ্য হয়ে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে মালিবাগ বাজারের ক্রেতা চিশতি অভিযোগ করে বলেন, "এমনিতেই সব পণ্যের দাম বাড়তি। তার ওপর নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নজরদারি করা জরুরি।"
অন্যদিকে সয়াবিন তেলের সংকট গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। সয়াবিন তেলের নতুন দাম অনুমোদনের পরও কোম্পানিগুলো খুচরা বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করছে না বলে অভিযোগ বিক্রেতাদের। বিভিন্ন স্থানে ২০৪ টাকা নির্ধারিত দামের এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। সেগুনবাগিচার বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় এক-দেড় মাস ধরে কোম্পানি তেলের অর্ডার নিচ্ছে না এবং তাদের কমিশন কমিয়ে লিটারে মাত্র ১ টাকা করা হয়েছে। যে কারণে বাধ্য হয়ে পরিচিত ক্রেতা ছাড়া অনেকে তেল বিক্রিই করছেন না। ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেলের দাম আরেক দফা না বাড়ানো পর্যন্ত সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিক্রি প্রতিনিধিরা। তবে খুচরা দোকানে সংকট থাকলেও বড় বড় সুপারশপগুলোতে নির্ধারিত দামে কিছুটা তেল-চিনি মিলছে।
সবজির বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শীতের আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে, যা বর্তমানে বাজারের সবচেয়ে দামি সবজি। আর মাত্র ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া পেঁপে ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ সবজিই ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে মিলছে না।
বাজারের হিসাব অনুযায়ী, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা, টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, কচুরমুখি ৮০ টাকা, বরবটি, ঝিঙে ও করলা ৮০ টাকা এবং পটল, ঢ্যাঁড়শ ও কাঁকরোল ৭০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস লাউয়ের দাম চাওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। একমাত্র কাঁচা মরিচের বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে; কয়েক সপ্তাহ আগে ২০০ টাকায় ওঠা মরিচ এখন মানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে নেমেছে।
রায়েরবাজারের ক্রেতা ইদ্রিস মিয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ বেগুন কিনেছি ১০০ টাকা, করলা ৮০ টাকা আর ছোট একটা লাউ ৫০ টাকায়। প্রতিটি জিনিসের দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।’
কয়েক সপ্তাহ ধরে চড়া থাকা ডিমের বাজারেও কোনো পরিবর্তনের আভাস নেই। ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়, আর পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে চারটির হালি ৫৫ টাকা (ডজন ১৬৫ টাকা) দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারে গিয়ে দেখা গেছে অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের ক্ষোভ। চাষের তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙ্গাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং মাঝারি শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে একটু বড় সাইজের রুই-কাতলা কিনতে গুনতে হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। নদীর বা দামি মাছের ক্ষেত্রে যেমন রূপচাঁদা, দেশি কই বা নদীর বেলে কিনতে কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকারও বেশি।
মাছ বিক্রেতা সুলতান জানান, আড়তে সরবরাহ কম-বেশির ওপর নির্ভর করে দাম একবেলা থেকে অন্যবেলায় ওঠানামা করছে। তবে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে ঢাকা শহরের খুচরা বাজারে পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ ভোক্তারা।
এসএ