দিনের শুরুটা কেমন হচ্ছে, তার প্রভাব পড়তে পারে সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে সকালে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করা উপকারী হতে পারে। শরীরচর্চা, কম সোডিয়ামযুক্ত খাবার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ঘুম— এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু সকালের কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করলেই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এমন নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ সঠিকভাবে চালিয়ে যাওয়া জরুরি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কম সোডিয়াম গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ঘুম থেকে উঠে হাঁটার অভ্যাস করুন
সকালের হালকা হাঁটা শরীরকে সক্রিয় করার পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম রক্তচাপ কমাতে এবং হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে।
বাইরে হাঁটার সুযোগ না থাকলে ঘরেও হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। তবে ব্যায়াম শুরু করার আগে বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একদিন হাঁটলেই রক্তচাপ কমে যাবে— বিষয়টি এমন নয়। বরং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের এএইচএ/এসিসি নির্দেশনাতেও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে মাঝারি মাত্রার শারীরিক সক্রিয়তার সুপারিশ করা হয়েছে।
নাশতায় কমান লবণ
সকালের খাবার থেকেই শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম ঢুকতে পারে। পরোটা, পুরি, সস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, প্যাকেটজাত খাবার কিংবা বেশি লবণ দেওয়া নাশতা নিয়মিত খেলে সোডিয়াম গ্রহণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়াতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২ হাজার ৩০০ মিলিগ্রামের বেশি সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিত নয়। উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে— এমন বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দিনে ১ হাজার ৫০০ মিলিগ্রামের সীমা আরও উপকারী হতে পারে।
তাই খাবারে আলাদা করে লবণ যোগ করার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময়ও লেবেলে থাকা সোডিয়ামের পরিমাণ দেখে নেওয়া যেতে পারে।
নাশতায় রাখুন পুষ্টিকর খাবার
সকালের খাবার হিসেবে শুধু চা-বিস্কুটের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার বেছে নেওয়া ভালো। ডিম, টক দই, ওটস, ডাল, সবজি, ফল, বাদাম ও বীজের মতো খাবার থেকে প্রোটিন ও ফাইবার পাওয়া যায়।
হেলথ.কম-এর এক প্রতিবেদনে সকালের খাবারে প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর চর্বির সমন্বয় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেশি লবণযুক্ত খাবার কমানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে ড্যাশ ধরনের হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও উপকারী হতে পারে। এ ধরনের খাদ্যতালিকায় বেশি পরিমাণে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও কম চর্বিযুক্ত খাবার রাখার পাশাপাশি সোডিয়াম কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সকালে কিছুটা সময় দিন মানসিক প্রশান্তিকে
মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপের একমাত্র কারণ নয়। তবে স্ট্রেসের সময় শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে সাময়িকভাবে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
দিনের শুরুতে তাই কয়েক মিনিট ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, মেডিটেশন, প্রার্থনা কিংবা শান্তভাবে বসে থাকার অভ্যাস করা যেতে পারে। নিয়মিত স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের চর্চা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনায় আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে।
ঘুম থেকে উঠে পানি পান করুন
রাতে ঘুমানোর পর শরীরে কিছুটা পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। সকালে পানি পান করলে শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে বেশি পানি পান করলেই উচ্চ রক্তচাপ কমে যায়— এমন প্রমাণ নেই।
শরীরে পানির পর্যাপ্ততা সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও প্রত্যেকের পানির চাহিদা এক নয়। বয়স, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে।
বিশেষ করে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র বা অন্য কোনো রোগ থাকলে অতিরিক্ত পানি পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সকালে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়ম
উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা উপকারী হতে পারে। তবে সঠিক রিডিং পেতে মাপার নিয়মও ঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, রক্তচাপ মাপার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ধূমপান, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান ও ব্যায়াম এড়িয়ে চলা উচিত। মাপার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট শান্তভাবে বসে থাকতে হবে। হাত টেবিলের ওপর এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে তা হৃদ্পিণ্ডের সমান উচ্চতায় থাকে। রক্তচাপ মাপার সময় কথা বলা বা ফোন ব্যবহার করা উচিত নয়।
একই সময়ে পরপর দুটি রিডিং নিয়ে তা লিখে রাখাও উপকারী। বাড়িতে রক্তচাপ মাপার জন্য ওপরের বাহুতে লাগানো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেয় এএইচএ। শুধু স্মার্টওয়াচ বা কাফবিহীন যন্ত্রের রিডিংয়ের ভিত্তিতে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সকালে রক্তচাপ কম দেখালেও ওষুধ বন্ধ নয়
উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করলে সকালে রক্তচাপ কিছুটা স্বাভাবিক বা কম দেখালেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়। অনেকের ক্ষেত্রে জীবনযাপনে পরিবর্তনের পাশাপাশি ওষুধও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাড়িতে রক্তচাপ মাপা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। তাই রক্তচাপের কোনো একটি রিডিং দেখে নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন বা বন্ধ করা উচিত নয়।
রক্তচাপ ১৮০/১২০-এর বেশি হলে
একবার রক্তচাপ কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে আবার রক্তচাপ মাপা যেতে পারে। তবে রক্তচাপ ১৮০/১২০ মিলিমিটার পারদের বেশি হলে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এক মিনিট অপেক্ষা করে পুনরায় মাপার পরামর্শ দেয়। এরপরও একই মাত্রায় থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
এর সঙ্গে যদি বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, পিঠে ব্যথা, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অসাড় হয়ে যাওয়া, দৃষ্টির পরিবর্তন কিংবা কথা বলতে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে তা জরুরি অবস্থা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সকালের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, কম লবণযুক্ত সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত রক্তচাপ মাপার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে উপকার দিতে পারে। তবে এসব অভ্যাস চিকিৎসার বিকল্প নয়। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ— দুটিই নিয়ম মেনে চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এসএ