কূটনীতিতে কখনো কখনো সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ হলো ‘অপেক্ষা’। কারণ অপেক্ষা করতে করতে এমন কিছু সময়সীমা পার হয়ে যায়, যেই মূল্যবান সময় আর ফিরে নাও আসতে পারে। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন তেমনই এক সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
গত দুই বছরে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা পারস্পরিক অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিস্তা ও গঙ্গার পানি, বাণিজ্য, স্থলবন্দর, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ- একটির সঙ্গে আরেকটির জটিলতা যোগ হচ্ছে। অথচ এই সময়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে নিয়মিত ও সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের ঘাটতিও ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফর সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। ঢাকার বক্তব্য, ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরি না হলে তাড়াহুড়ো করে সফরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
রাষ্ট্রীয় সফর তো নিছক সৌজন্য সফর নয়। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে, প্রতীকী মূল্য আছে, প্রত্যাশা আছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: কূটনীতিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, নাকি সংলাপের মাধ্যমেই সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে?
ঢাকা-দিল্লির বর্তমান বাস্তবতা দ্বিতীয় পথটির পক্ষেই বেশি জোরালো। কারণ ভূগোলের সঙ্গে অভিমান চলে না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সত্যটি কোনো কূটনৈতিক নথিতে লেখা নেই। সেটি লেখা আছে মানচিত্রে। বাংলাদেশের তিন দিকের স্থলসীমান্ত প্রায় ভারতবেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য অভিন্ন নদীর স্রোতধারা। এসব নদী সীমান্ত মানে না। অন্যদিকে স্থলবন্দর দিয়ে চলে বিপুল বাণিজ্য। সীমান্তের ওপার থেকে আসে পণ্য, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
অর্থাৎ ঢাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে পারে, কিন্তু দুই দেশের ভৌগোলিক সম্পর্ক বদলায় না। এই কারণেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য পছন্দের কোনো পররাষ্ট্রনীতি নয়, বাস্তবতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর অর্থ ভারতের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হতে হবে- এমন নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে সবারই অল্পবিস্তর বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকে। এটা সারা পৃথিবীতেই স্বাভাবিক চিত্র। আর এসব ইস্যু মেটানোর সংলাপই হলো একমাত্র পথ। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা সহজ। অনেকেরই তাতে ইন্ধন থাকে। পরিণত বোধের ও দেশের মানুষের স্বার্থের কাজ হলো, সেই দরজা খোলা রেখেই সমস্যাগুলোর সমাধান করা। রাষ্ট্রীয় সফরের প্রয়োজনীয়তা এখানেই।
এর মধ্যেই গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির তিন দশকের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে এ বছরের ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ চুক্তি পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে দিল্লিতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখানে সময়ের একটি নির্মম বৈশিষ্ট্য আছে। রাজনৈতিক অস্বস্তি কয়েক মাস অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু চুক্তির মেয়াদ পারে না।
বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের এমন কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাংলাদেশে আসে, যেটা ভৌগোলিক কারণে সবচেয়ে সহজ ও সস্তা হয়। এটা উভয় দেশের জন্য উইন-উইন পরিস্থিতি। কিন্তু ভারতবিরোধিতার সস্তা জিকির তুলে এখানেও নানান ধরনের সমতা-অসমতার প্রশ্ন তোলা হয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন বলেই বাংলাদেশ সহজ পথে ও তুলনামূলক সুবিধাজনক মূল্যে আমদানি করে। একই ব্যাপার ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে ভারতও বাংলাদেশ থেকে আমদানি করবে। এটা প্রয়োজনের প্রশ্ন। প্রয়োজন কোনো অজুহাত বোঝে না।
চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন- সাধারণ মানুষের জীবনে এগুলোর দামই অনেক সময় সরকারের জনপ্রিয়তা বা অজনপ্রিয়তার বাস্তব মাপকাঠি হয়ে ওঠে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে ভারত থেকে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে কোটার নিশ্চয়তা বা সরবরাহসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পেতে সময় লাগে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হয়, বাজারের অনিশ্চয়তাও তত বাড়ে। অথচ একটি নিয়মিত শীর্ষপর্যায়ের সংলাপ কাঠামো থাকলে এ ধরনের সমস্যায় দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ কূটনীতির প্রভাব পড়ে বাজারে, রান্নাঘরে, কৃষকের মাঠে। শীর্ষপর্যায়ের সংলাপের মাধ্যমেই যেকোনো বিষয়ের সহজ সমাধান সম্ভব।
২০২৫ সালের মার্চে স্থানীয় বস্ত্রশিল্প রক্ষায় স্থলপথে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধের সুপারিশ নতুন জটিলতা তৈরি করেছিল। আবার গত আগস্টে দুই দেশের আলোচনায় সীমান্ত হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দর পূর্ণ সচল করা এবং সুতা আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয় এসেছে। বছরের শেষ নাগাদ সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা সেপা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যও রয়েছে।
এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোকে বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলবে না। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের পথে, তখন ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কাঠামো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই সম্পর্ককে কেবল আমদানি-রপ্তানির হিসাব দিয়ে দেখা যাবে না। দেখতে হবে বাজার, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দৃষ্টিতে।
মনে রাখতে হবে, নীরবতা কখনো কখনো সহজ সমাধানকেও হিমঘরে পাঠিয়ে দেয়। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। ছোট ঘটনাগুলোও বড় হয়ে ওঠে।
ভারত সফর নিয়ে আলোচনায় একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। রাষ্ট্রীয় সফর মানেই সম্পর্কের সব সমস্যা মিটে গেছে- এমন নয়। আবার সফর মানেই কোনো পক্ষ অন্য পক্ষের কাছে নতি স্বীকার করেছে- এটিও নয়। বরং একটি রাষ্ট্রীয় সফর হতে পারে মতপার্থক্যগুলোকে সরাসরি রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার সুযোগ।
সুতরাং বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ ও বাস্তবতার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য তৈরি করা। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা এগিয়ে আসছে। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। তিস্তা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। নিত্যপণ্যের সরবরাহেও দুই দেশের সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
এই বাস্তবতায় ‘উপযুক্ত পরিবেশ’-এর অপেক্ষা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তববাদী প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত- সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর কি সংলাপ শুরু হবে, নাকি সংলাপ শুরু করেই সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে?
দ্বিতীয় পথটিই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতের রাষ্ট্রীয় সফর কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়। এটি দুই দেশের সম্পর্কের সব সমস্যার সমাধানের নিশ্চয়তাও নয়। কিন্তু এটি একটি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক দরজা খুলে দিতে পারে।
সেই দরজার ওপারে তিস্তা থাকবে, গঙ্গা থাকবে, সীমান্ত থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, থাকবে পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরির সদিচ্ছা। ভূগোলকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। নদীকে থামানো যায় না। সীমান্ত সরানো যায় না। বাণিজ্যের পথে টানাপোড়েন তৈরি করে দেশের ক্ষতি করা যায় না। তাই বাস্তববাদিতাই একমাত্র পথ।
আর সেই পথের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একটি সফর। দিল্লি সফরের ‘উপযুক্ত পরিবেশ’-এর অজুহাত তুলে কালক্ষেপণ করলে বরং পরিবেশ ক্রমশ আরও অনুপযুক্ত হয়ে উঠতেও পারে।
মরমি কবি বিলাল নসাঁই বলেছেন: ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’
-টিএস