আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রতিবেদক: স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে উত্তপ্ত ও সংকটময় সময় পার করছে মানবজাতি। একদিকে ইউরোপের নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে ফেলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিকল করে দেওয়া ইরান কেন্দ্রিক সংঘাত। বিচ্ছিন্ন মনে হলেও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এই দুটি বড় সংঘাত এখন একই সুতোয় গাঁথা এবং এই সংযোগই তৈরি করছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাজনক এক সমীকরণ।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের ইতি টানা সম্ভব হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কেন্দ্রিক সংঘাতের সমাপ্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই যুদ্ধের গোপন সাঁকো
আপাতদৃষ্টিতে ইউক্রেন ও ইরানের লড়াই পৃথক মনে হলেও রণকৌশল ও ভূরাজনীতিতে এদের দূরত্ব এখন ঘুচে গেছে। কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার সামরিক চালান আদান-প্রদান এবং ইউক্রেনীয় ড্রোন বিশেষজ্ঞদের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্জিত অভিজ্ঞতা প্রয়োগের ঘটনা দুটি যুদ্ধকে সামনাসামনি নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘায়িত এই সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের মূল ধমনী 'হরমুজ প্রণালি'কে ঝুঁকির মুখে ফেলায় পুরো বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দ্বারপ্রান্তে।
ক্লান্ত সব পক্ষ, তবুও ছাড়ের অভাব
সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে উভয় পক্ষই চরমভাবে বিপর্যস্ত। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৫ লাখ সৈন্য নিহত হওয়াসহ মোট ১৫ লাখ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে রাশিয়া। একই সাথে ড্রোন হামলায় তাদের তেল শোধনাগার ও অর্থনীতি মারাত্মক ধসের মুখে। অন্যদিকে, অন্তত দেড় লাখ সৈন্য হারিয়ে এবং অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে জনমিতিক বিপর্যয়ে পড়েছে ইউক্রেন। ফলে মস্কো ও কিয়েভ—উভয় পক্ষই মানসিকভাবে যুদ্ধ শেষ করার তাগিদ অনুভব করলেও নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থে ছাড় দিতে পারছে না।
একই চিত্র মধ্যপ্রাচ্যেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ১৭টিরও বেশি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার এবং পরমাণু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি ভয়াবহ সংকটে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ধারণা ভুল প্রমাণিত করে সরকারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইরানের আমজনতা, যা মার্কিন প্রশাসনকে এক জটিল সমীকরণে ফেলে দিয়েছে।
পুতিন-ট্রাম্প সমীকরণ ও শান্তির পথ
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক উপায়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। আর এই সুবর্ণ সুযোগটিই নিতে চান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তেহরান যেহেতু অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থনের জন্য মস্কোর ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে, তাই পুতিনের বার্তা স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের প্রভাব খাটিয়ে ইউক্রেনকে বাগে এনে ইউরোপের যুদ্ধ থামাতে পারে, তবে তিনিও ইরানকে চাপ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রতিনিধি দল ইতিপূর্বে রাশিয়া ও ইউক্রেন সফর করে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছে। ইতিমধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব রেখেছেন।
সব মিলিয়ে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই ভূরাজনৈতিক সংকটের চাবিকাঠি এখন ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যস্থতার টেবিলে। ইউক্রেন যুদ্ধের একটি টেকসই সমাধান বের করা সম্ভব হলেই কেবল ইরান কেন্দ্রিক এক মহাসংকট থেকে মুক্তি পেতে পারে বিশ্ব।
এসএ