১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঙালি সৈনিকদের সামরিক সক্ষমতা ও সাহসিকতা প্রমাণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ৬ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৭ দিনের এই যুদ্ধে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন রণাঙ্গনে বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকরা অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন। বিশেষ করে খেমকরণ রণাঙ্গনে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব যুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
সে সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের ‘নন-মার্শাল রেস’ বা যুদ্ধের জন্য অনুপযুক্ত জাতি হিসেবে দেখার একটি প্রচলিত ধারণা ছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে বাঙালি সৈনিকদের বীরত্ব সেই ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
খেমকরণে জিয়ার নেতৃত্ব১৯৬৫ সালে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট লাহোর সেনানিবাসে অবস্থান করছিল। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল এ টি কে হক এবং উপাধিনায়ক ছিলেন মেজর মঙ কিউ। মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন আলফা কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার।
পাকিস্তান ১৯৬৫ সালের আগস্টের শুরুতে কাশ্মীরে ‘অপারেশন জিব্রাল্টার’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানে আক্রমণ চালালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়।
ভারতীয় বাহিনীর লাহোরমুখী আক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনায় ৪ সেপ্টেম্বর রাতে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে লাহোরের প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে কাসুর জেলার বেদিয়ান এলাকায় প্রতিরক্ষা অবস্থানে মোতায়েন করা হয়। ইউনিটটি লাহোরের ১১ পদাতিক ডিভিশনের অধীন ১০৬ পদাতিক ব্রিগেডের অংশ ছিল।
লে. কর্নেল এ টি কে হকের পরিকল্পনায় ব্যাটালিয়নের চারটি রাইফেল কোম্পানি বিআরবি ক্যানেলের পশ্চিম তীর বরাবর প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়। সীমান্ত ছিল ক্যানেলের কয়েকশ গজ দূরে।
৬ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টার দিকে পদাতিক, ট্যাংক ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় ভারতীয় বাহিনী বেদিয়ান হেডওয়ার্কস এলাকায় আক্রমণ চালায়। কিন্তু ১ম ইস্ট বেঙ্গলের তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার লড়াই শেষে ভারতীয় বাহিনী পিছু হটে।
এরপর ওই দিন দিনভর ও রাত পর্যন্ত একাধিকবার আক্রমণ চালানো হলেও ভারতীয় বাহিনী ১ম ইস্ট বেঙ্গলের প্রতিরক্ষা অবস্থান দখল করতে পারেনি। পরবর্তী ১৭ দিনেও একাধিক আক্রমণ চালিয়ে তারা বিআরবি ক্যানেল অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়।
১ম ইস্ট বেঙ্গলের রেকর্ড১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ১৫টি বীরত্বসূচক খেতাব লাভ করে, যা পাকিস্তানের সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়।
এ যুদ্ধে সিপাহি আবুল হাসেম সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে তঘমায়ে জুরাত খেতাব পান। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত হন।
যুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন আলফা কোম্পানির একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল নিজেদের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভারতীয় ট্যাংক উদ্ধার করে রণক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া। বর্তমানে ট্যাংকটি চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে সংরক্ষিত রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান নিজেও ১৯৬৫ সালের খেমকরণ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের ভালো সৈনিক নয়- এমন যে ধারণা ছিল, খেমকরণের যুদ্ধে তা ভেঙে যায়। তাঁর নেতৃত্বাধীন কোম্পানিও ওই যুদ্ধে পুরস্কৃত হয়েছিল।
আকাশযুদ্ধেও বাঙালিদের সাফল্যস্থলযুদ্ধের পাশাপাশি ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি পাইলটরাও অসাধারণ দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন।
স্কোয়াড্রন লিডার এম এম আলম ৭ সেপ্টেম্বর পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে আলোচনায় আসেন। ফ্লাইট লে. সাইফুল আজম, স্কোয়াড্রন লিডার গোলাম মোহাম্মদ তাওয়াব, স্কোয়াড্রন লিডার আলাউদ্দিন আহমেদ, ফ্লাইট লে. এম শওকত উল ইসলাম ও ফ্লাইট লে. মমতাজ উদ্দিন আহমেদসহ আরও কয়েকজন বাঙালি পাইলট বিমানযুদ্ধে সাহসিকতার নজির স্থাপন করেন।
১৯৭১-এর আগে আত্মবিশ্বাসের বড় পরীক্ষা১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ পাকিস্তানের তিন বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সদস্যদের সাফল্য তাদের সামরিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ শেষে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যদের সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। লাহোর রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে রেজিমেন্টটি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।
এই যুদ্ধ একই সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাগত দুর্বলতাও স্পষ্ট করে দেয়। একদিকে বাঙালি সৈনিকদের বীরত্ব পাকিস্তানি সামরিক ব্যবস্থায় তাদের সক্ষমতার স্বীকৃতি এনে দেয়, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান যে সামরিকভাবে অরক্ষিত ছিল, সেটিও নতুন করে আলোচনায় আসে।
৬১ বছর আগে সংঘটিত সেই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সামরিক সদস্যদের ভূমিকার ক্ষেত্রেও মনোবল ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই ১৯৬৫ সালের খেমকরণ রণাঙ্গনে মেজর জিয়াউর রহমান ও ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীরত্ব বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
-টিএস