দেশের মানুষ যাতে ভবিষ্যতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে না পড়েন, সে লক্ষ্যে বিএনপি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বর্তমান জ্বালানি সংকটে ভোগান্তির জন্য শিল্প-কারখানার মালিকসহ সাধারণ মানুষের কাছে দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তারেক রহমান বলেন, “আজকে যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। বহু মানুষ, বহু শিল্প-কলকারখানার মালিকসহ সাধারণ মানুষ বিদ্যুতের কষ্টে বা জ্বালানি কষ্টে আছেন। তাদের সকলের কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আগামীতে যেন দেশের মানুষকে এই জ্বালানি সংকটে পড়তে না হয়, সেভাবেই বিএনপি তার কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে।”
বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে কিছু রাজনৈতিক দল ‘গুপ্ত’ বেশ ধারণ করে স্বৈরাচারের ভেতরে লুকিয়ে ছিল বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে তারাই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কি না, তা জনগণকে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, “স্বৈরাচার আমলে আমরা দেখেছি একটি রাজনৈতিক দল গুপ্তবেশ ধারণ করেছিল। তারা স্বৈরাচারের ভেতরে গুপ্তভাবে লুকিয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি, তাদের নিজেদের লোকজনই বেরিয়ে এসে বিষয়টি স্বীকার করেছে।”
দেশবাসীকে সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারের সময় যারা আড়ালে লুকিয়ে ছিল, তারা এখন ভেতর থেকে অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন হলে তারা আবার স্বৈরাচারকে সামনে নিয়ে আসার কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতাকর্মীদের জনগণকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কে কাকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে আমরা উন্মুক্ত করে দেই।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে আড়াল ও আশ্রয় দিয়েছে। এখন তাদের এই রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
বিএনপিকে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষাকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “দেশের মানুষের যে গণতান্ত্রিক অধিকার, সেটিকে যদি কেউ নিশ্চিত করে থাকে, সেই রাজনৈতিক দলটির নাম হচ্ছে বিএনপি। সে কারণেই প্রত্যেকটি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।”
তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হবে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ এবং নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালুর পেছনে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও বিএনপির যুগান্তকারী অবদান রয়েছে।
খালেদা জিয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করে তাদের দেশ গঠনে সম্পৃক্ত করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল।
দেশের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় বিএনপির ভূমিকা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের পর দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে দেশকে মুক্ত করে সামনে এগিয়ে নিতে বিএনপির ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তিনি বলেন, গত ১৬-১৭ বছরে বিরোধী দলের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও নির্যাতন চালানো হলেও বিএনপি রাজপথে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং এর সফলতার পূর্ণ কৃতিত্ব দেশের আমজনতার বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে থেকে বিএনপি সেই লড়াই সফল করেছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ আন্দোলনে নিহত সব শহীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং বিএনপির ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
বিএনপি আয়োজিত এ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সভায় অর্থনীতিবিদ মাহবুবউল্লাহ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ও ইসমাইল জবিহউল্লাহ বক্তব্য দেন।
উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া পাঁচ দিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি এ আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
টিআইএস