১১ বছর পর এক লাফে দ্বিগুণ হলো সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন। নতুন বেতন কাঠামোয় স্বস্তি ফিরেছে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে। কিন্তু একই সময়ে নতুন দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে বেসরকারি খাতে কর্মরত লাখো মানুষের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা—সরকারি বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে বাজারে চাহিদা ও ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সীমিত আয়ের মানুষের ঘাড়ে।
এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির কারণে চাপে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় বাজারে পণ্য ও সেবার দাম নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা করছেন বেসরকারি খাতের কর্মীরা।
তাদের দাবি, শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ালেই হবে না; বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
এক লাফে দ্বিগুণ বেতন
নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনও ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বেতন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা কার্যকর হবে গত জুলাই থেকে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি। দীর্ঘ সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় না বাড়ায় যে চাপ তৈরি হয়েছিল, নতুন বেতন কাঠামো তা অনেকটাই কমাতে পারে।
কিন্তু অর্থনীতির অন্য প্রান্তে প্রশ্ন উঠছে—এই বাড়তি অর্থনীতির প্রভাব সামগ্রিক বাজারে কীভাবে পড়বে?
‘বেতন বাড়লে বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে’
চলমান জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বেসরকারি খাতেও মজুরি বৃদ্ধির চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
তার মতে, সরকারি খাতে বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও মজুরি সমন্বয়ের প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে হঠাৎ করে মজুরি বাড়ানো অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন খরচ ও পণ্যের দামের ওপর। ফলে যে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা চলছে, সেখানে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মাথাপিছু আয় বাড়লেও বৈষম্য কমছে না
বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বছরে প্রায় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও সেই আয় সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। আয় বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
একদিকে একটি শ্রেণির আয় ও সুযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের বড় অংশকে প্রতিনিয়ত খাদ্য, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহনসহ মৌলিক ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃত চাপকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে না পারলে আয় বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে।
সমাধান কর্মসংস্থানে
অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য নতুন চাকরি, শিল্পে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
কারণ শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। মানুষের আয় বাড়াতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের জীবনযাত্রাকে স্বস্তি দেওয়ার একটি পদক্ষেপ হয়, তাহলে একই যুক্তিতে বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুল জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ানোর পথও তৈরি করতে হবে।
‘একজনের স্বস্তি যেন অন্যের বোঝা না হয়’
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াতে পারে—যা উৎপাদন ও ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তাই অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি—যেখানে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহও বাড়ানো হবে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—সরকারি বেতন বাড়ার সুফল যেন বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির কারণ না হয়। বরং এই বেতন বৃদ্ধি যেন অর্থনীতিতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বৃহত্তর চক্র তৈরি করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য শুধু কত টাকা বেতন বাড়ল, কিংবা মাথাপিছু আয় কত হলো—তা দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ তার আয় দিয়ে কতটা স্বস্তিতে পরিবার চালাতে পারছেন, সেটিই অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব সূচক।