বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষার বিদ্যমান দুর্বলতা চিহ্নিত করে কারিকুলাম আধুনিকীকরণ, ল্যাবরেটরি শক্তিশালীকরণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।
ড. মিলন বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এ লক্ষ্যেই সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারিগরি শিক্ষাকে আরও মানসম্মত ও কার্যকর করতে চীনের সঙ্গে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীনের শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান সংযোগের কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশটির কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা শিল্পের চাহিদাভিত্তিক। সেখানে কারিকুলাম, ল্যাবরেটরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম ও শিল্পের চাহিদাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দেশের কারিগরি শিক্ষায় কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দুর্বলতা পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কারিকুলাম পরিবর্তন, ল্যাবরেটরি শক্তিশালী করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। বিভিন্ন পর্যায়ে হাজার হাজার শিক্ষকের পদ রয়েছে। নিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব পদ পূরণ করতে হয়। সরকার বিষয়টি সমন্বয় করছে। গত ছয় মাসে এ বিষয়ে দৃশ্যমান ফল দেখাতে না পারলেও কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যকর করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইকোসিস্টেম’ প্রয়োজন। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম তৈরি, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে এসব বিষয় দেখা হয়েছে এবং বাংলাদেশে তা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কারিগরি শিক্ষায় চীনা ভাষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে ড. মিলন বলেন, সব জায়গায় একই ভাষা চালুর পরিকল্পনা নেই। যে দেশে যে ভাষার প্রয়োজন, সে অনুযায়ী ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। যেসব এলাকায় জাপানি কোম্পানির কার্যক্রম বেশি, সেখানে জাপানি ভাষা; দক্ষিণ কোরীয় বা আরব দেশের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বেশি হলে সংশ্লিষ্ট ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। চীনা কোম্পানির ক্ষেত্রে চীনা ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের চীনা কোম্পানিতে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাঁদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়বে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ড. মিলন বলেন, দেশে অনেক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল সেন্টার এবং টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ তৈরি করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নও হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি কারিকুলাম সময়োপযোগী করা, ল্যাবরেটরি শক্তিশালী করা এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরি নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষায় নতুন বিষয় যুক্ত করা ও ল্যাবরেটরি উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা জীবনব্যাপী শিক্ষা। এর মাধ্যমে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এ খাতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, কারিগরি সহযোগিতা ও বাজেট সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এ খাতে বাজেট বাড়িয়েছেন। আগামী দিনগুলোতে এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া উপস্থিত ছিলেন।