বর্ষা মৌসুমে মেঘনা নদী যখন বৃষ্টির পানিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, ঠিক তখনই ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের নদীপাড়ের মানুষের জীবনে শুরু হয় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। তীব্র স্রোতের টানে নদীবক্ষে ভেসে আসে অগণিত গাছপালা ও ডালপালা। আর এই ভেসে আসা প্রকৃতির ভাসমান সম্পদ সংগ্রহ করেই জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের মেঘনা নদীর পাড়ের প্রায় অর্ধশতাধিক হতদরিদ্র ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। এটাই তাদের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
বর্ষার মেঘনার উত্তাল ঢেউ ও প্রবল স্রোতের মধ্যেই নদীর তীরে ভিড় জমায় নারী, পুরুষ ও শিশুরা। জোয়ারের পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন মনপুরার চরপিয়াল, কুকরি ও ঢালচর বনাঞ্চলসহ উজানের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভেঙে যাওয়া ছোট-বড় গাছের ডালপালা ভাসতে ভাসতে তীরের কাছাকাছি আসে, তখন স্থানীয়রা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নেমে পড়ে। উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও পেটের তাগিদে এই ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না তারা।
জীবনের ঝুঁকি ও অক্লান্ত পরিশ্রমে নদী থেকে বাঁশ ও দড়ি দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের আঁকড়ি দিয়ে টেনে টেনে ভাসমান কাঠগুলো পাড়ে তুলে আনা হয়। অনেকে আবার সাঁতার কেটে নদী থেকে এসব কাঠ সংগ্রহ করেন। পরে তা শুকিয়ে বাজারে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে চলছে তাদের সংসার।
নদী থেকে ভেজা কাঠ তোলার পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের সংগ্রাম। কাঠগুলো ভেজা থাকায় সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বা বিক্রি করা যায় না। নদীর পাড়েই স্তূপ করে রাখা হয় এসব ডালপালা। এরপর টানা কয়েক দিন কড়া রোদে শুকিয়ে এগুলোকে ব্যবহারের উপযোগী ও জ্বালানি কাঠে রূপান্তর করা হয়। বর্ষার দিনে আকাশ মেঘলা থাকলে কাঠ শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের নদীপাড়ের এলাকায় গেলে সারি সারি গাছপালা ও ডালপালার স্তূপ চোখে পড়ে। দেখে মনে হয়, যেন ধানের আঁটি সাজিয়ে রাখা হয়েছে নদীর পাড়ে।
কাঠগুলো পুরোপুরি শুকানোর পর আঁটি বেঁধে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি কাঠ হিসেবে বিক্রি করা হয়। এর মূল ক্রেতা স্থানীয় গৃহস্থ পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ইটভাটার মালিকরা। প্রতিটি পরিবার প্রতিদিন কাঠ বিক্রি করে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে।
নদীপাড়ের এই পরিবারগুলোর অনেকেরই নিজস্ব কোনো কৃষিজমি বা স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। বর্ষায় যখন নদীতে ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ থাকে, তখন এই ভেসে আসা গাছপালা ও ডালপালাই তাদের একমাত্র বিকল্প কর্মসংস্থান হয়ে দাঁড়ায়। মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার সময়ে কিংবা চরম অভাবের দিনে এই সামান্য আয়টুকুই তাদের পুরো পরিবারের মুখে অন্ন জোগায়।
চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের নদীপাড়ের এক বাসিন্দা রমিজ আলী জানান, “নদীতে যখন জোয়ার আসে আর বৃষ্টি বাড়ে, তখন আমাদের ঘুম থাকে না। নদীতে গাছপালা ও ডালপালা ভাসতে দেখলেই পানিতে নেমে পড়ি। এই গাছপালা ও ডালপালা না পেলে বর্ষার দিনে আমাগো না খাইয়া থাকা লাগতো। নদী আমাগো ঘরবাড়ি ভাঙলেও এই গাছপালা ও ডালপালা দিয়া কয়টা দিন বাঁচার পথ দেখায়।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃতির রুদ্ররূপের শিকার হয়ে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার চরমাদ্রাজের বেড়িবাঁধের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। তবে মেঘনার জোয়ারে ভেসে আসা গাছপালা ও ডালপালা তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। নদী থেকে সংগৃহীত এসব জ্বালানি কাঠ ও ডালপালা বিক্রি করে কোনোমতে ডাল-ভাত জুটলেও তাদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিম্ন।
চরমাদ্রাজের এই প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সরকারি বা বেসরকারিভাবে চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের এই সংগ্রামী পরিবারগুলোকে দুর্যোগকালীন আর্থিক সহায়তা কিংবা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদীতে নামার এই প্রবণতা কমত এবং তাদের জীবনযাত্রা আরও নিরাপদ হতো।
এসএফ/আরএন