শনিবারের মধ্যে হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর ভাড়া প্রতি কেজি ৫ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা না হলে আগামী রোববার থেকে নির্ধারিত ওই হার নিজেরা জমা দিয়ে হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনের ঘোষণা দিয়েছেন রংপুরের আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরীর অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত রংপুর-কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের নবীগঞ্জ এলাকায় অপু মুন্সি হিমাগারের সামনে কয়েক হাজার আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং আলু ছড়িয়ে দিয়ে অবরোধ করেন। এতে রংপুরের সঙ্গে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ প্রায় এক ঘণ্টা বন্ধ থাকে। দুই পাশে বিপুলসংখ্যক যানবাহন আটকা পড়ে। ভ্যাপসা গরমে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।
বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীরা হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরীর ছবি ও কুশপুত্তলিকায় জুতা নিক্ষেপ করেন। পরে কুশপুত্তলিকায় আগুন ধরিয়ে দেন তারা। কেউ কেউ সেখানে থুথু নিক্ষেপ করেও প্রতিবাদ জানান।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারিভাবে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আলু সংরক্ষণের ভাড়া সর্বোচ্চ ৫ টাকা ২০ পয়সা হওয়ার কথা থাকলেও রংপুরের হিমাগারগুলোতে প্রতি কেজি আলুর জন্য ৭ টাকা থেকে সাড়ে ৭ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে আলু বিক্রি করে ব্যাপক লোকসানে পড়ছেন তারা।
লালমনিরহাটের রাজপুর ইউনিয়ন থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কৃষক মোহাম্মদ সাজিদুল ইসলাম বলেন, তাঁর হিমাগারে ২৫০ বস্তা আলু রয়েছে। ২৫ শতক জমি লিজ নেওয়া, সার-কীটনাশক, বীজ, শ্রমিক, পানি ও সেচসহ আলু উৎপাদনে বড় অঙ্কের খরচ হয়। বস্তায় ভরে হিমাগারে নেওয়া পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুর খরচ পড়ে ২২ থেকে ২৩ টাকা। এর সঙ্গে ৭ টাকা পর্যন্ত সংরক্ষণ ভাড়া যোগ হলে খরচ আরও বেড়ে যায়। অথচ বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৪ টাকা কেজি দরে।
তিনি বলেন, “আমরা কৃষক কীভাবে বাঁচব? আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। বাধ্য হয়ে বাড়িঘর বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।”
কাউনিয়ার টেপামধুপুরের কৃষক মুসলিম উদ্দিন বলেন, তাঁর হিমাগারে প্রায় ২ হাজার বস্তা আলু রয়েছে। হিমাগার মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “এবার আমরা আন্দোলনে নেমেছি—হয় জীবন দেব, নয়তো ভাড়া ৫ টাকা করব। দাবি না মানলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
পীরগাছার কল্যাণী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মান্নানের দাবি, দেশের অন্যান্য এলাকায় ৬৫ কেজির এক বস্তার জন্য যেখানে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে, রংপুরে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৪৩৫ টাকা। তিনি বলেন, “ভাড়া ৫ টাকা ২০ পয়সা করা না হলে আমরা সব কোল্ডস্টোরেজে তালা লাগিয়ে দেব।”
রংপুর জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির কার্যকরী সদস্য রাসেল মিয়া অভিযোগ করেন, হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরীর নির্দেশেই রংপুরে ৭ থেকে সাড়ে ৭ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তিনি তাঁকে “আওয়ামী লীগের দোসর” আখ্যা দিয়ে পদত্যাগের দাবি জানান এবং রংপুরে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব মোবারক হোসেন মনসুর বলেন, দেশের ২৫টি জেলার প্রায় ৩৫০টি হিমাগারে সমীক্ষা চালিয়ে সরকার গঠিত কমিটি খরচ ও লাভ বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৫ টাকা ২০ পয়সা সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণ করেছে। কিন্তু হিমাগার মালিকরা ৭ টাকা ২৫ পয়সা পর্যন্ত নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর দাবি, রংপুরে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে প্রায় ১৮ টাকা এবং বস্তাসহ হিমাগারে নেওয়া পর্যন্ত আরও প্রায় ৪ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে ৭ টাকা ভাড়া যোগ হলে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৯ টাকা। অথচ বাজারে আলুর দাম প্রায় ১৪ টাকা। ফলে কৃষক বড় ধরনের লোকসানে পড়ছেন।
আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম দাবি করেন, রংপুর অঞ্চলের হিমাগারগুলোতে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করে কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হচ্ছে। তিনি হিমাগার মালিকদের “সিন্ডিকেট” ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান।
তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “শনিবারের মধ্যে আমাদের দাবি মেনে না নিলে রোববার (৩০ আগস্ট) থেকে আমরা নির্ধারিত ৫ টাকা ২০ পয়সা হারে টাকা দিয়ে নিজেরাই হিমাগার থেকে আলু বের করে নেব। এ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায় সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে।”
আন্দোলনকারীরা জানান, আলুর সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি সংশ্লিষ্ট এলাকার খরচ ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করে। রংপুরের কমিটির সদস্যরা সুপারিশে স্বাক্ষর করলেও হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাতে স্বাক্ষর করা হয়নি বলে দাবি তাদের। এরপর হিমাগার মালিকরা প্রতি কেজি আলুর জন্য ৭ টাকা থেকে ৭ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করেন বলে অভিযোগ করেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
এ নিয়ে জুন মাস থেকেই আন্দোলন করে আসছেন তারা।
হিমাগার মালিকদের বক্তব্য
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত প্রতি কেজি ৬ টাকা ৭৫ পয়সার পরিবর্তে তারা ৬ টাকা ৩২ পয়সা করে সংরক্ষণ ভাড়া নিচ্ছেন। তাঁর দাবি, এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। যারা আন্দোলনের নামে মব তৈরির চেষ্টা করছেন, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এলওয়াই/আরএন