ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
হালাল সার্টিফিকেশনের দায়িত্বে ধর্ম মন্ত্রনালয়
৩.৫৬ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতির হাতছানি
✎ তরিকুল ইসলাম সুমন
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১৫ পিএম
X

বিশ্বব্যাপী বড় হচ্ছে হালাল পণ্যের বাজার। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নয়, নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্যের চাহিদাও এই বাজারকে বড় করছে। খাবার থেকে প্রসাধনী। ওষুধ থেকে পোশাক। পর্যটন থেকে বিনোদন। সব ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে হালাল অর্থনীতির নতুন বাজার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও হালাল অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সম্ভাবনাময় খাতের দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন । এ ক্ষেত্রে তিনি একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।

গত ২৩ আগস্ট ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’ (কার্যবিধি) সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর ফলে হালাল পণ্যের মান নির্ধারণ ও সনদ দেওয়ার বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এবিষয়ে একটি  সংশোধিত প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর সংশ্লিষ্ট অংশে এ সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধনের ফলে রুলস অব বিজনেসের সিডিউল-১ বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনসংক্রান্ত তালিকায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ‘৩৪. মিনিস্ট্রি অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স’ শিরোনামের আইটেম নম্বর ২২-এর পর নতুন করে ২৩ নম্বর আইটেম যুক্ত করা হয়েছে। নতুন সংযোজিত আইটেমে ‘ম্যাটার্স রিলেটিং টু হালাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড সার্টিফিকেশন’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ, হালাল পণ্যের মান নির্ধারণ এবং এ-সংক্রান্ত সনদ দেওয়ার বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। তবে হালাল সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আইনগত ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। ‘রুলস অব বিজনেস’ সংশোধনের ফলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে হালাল পণ্যের মান নির্ধারণ ও সনদ দেওয়ার দায়িত্ব এখন প্রশাসনিকভাবে স্পষ্ট হলো।

সম্প্রতি স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি (এসজিআইই) ২৫-২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ছয়টি ভোক্তা খাতে মুসলিমদের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৯ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০২৪ সালের বাজারের আকার প্রায় ৩১৯ লাখ কোটি টাকা। ২০২৯ সালে তা প্রায় ৪৩৮ লাখ কোটি টাকা হতে পারে।এর মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত হলো হালাল খাদ্য। ২০২৪ সালে এই খাতে বিশ্বব্যাপী ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ৫৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৯ সালে তা ২ দশমিক ০৬ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। হালাল খাদ্যের পাশাপাশি পরিমিত বা ইসলামসম্মত পোশাক, মুসলিমবান্ধব পর্যটন, ওষুধ, প্রসাধনী এবং মিডিয়া ও বিনোদনও দ্রুত বাড়ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী “আসিয়ান অঞ্চলে হালাল ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা” শীর্ষক এক সেমিনারে  বলেন, হালাল অর্থনীতিকে এখন আর শুধু খাদ্য ও পানীয় খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এটি বর্তমানে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, মোডেস্ট ফ্যাশন, পর্যটন, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বৃহৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান শর্ত। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক হালাল বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশে একটি স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশের পণ্যের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা বাড়াবে এবং নতুন বাজার তৈরিতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, চামড়া, পোশাক ও পাট খাতের শক্ত ভিত্তি আছে। বিশেষ করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মাংস, মাছ, দুধ, বিস্কুট, নুডলস, মসলা, পানীয়, মিষ্টি, বেকারি পণ্য এবং ফ্রোজেন ফুডের বাজারে হালাল সনদ যুক্ত করা গেলে রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।বাংলাদেশে হালাল পণ্যের চাহিদা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ভোক্তাদের হালাল খাবার কেনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা, নৈতিকতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পণ্যের সত্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।এর আগে বাংলাদেশের ভোক্তা আচরণ নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। গবেষণায় বলা হয়, হালাল পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তার আস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। সনদের বিশ্বাসযোগ্যতা কম হলে বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২০০৭ সাল থেকে প্রায় ২৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে হালাল সনদ দিয়েছে।এর মধ্যে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান হালাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার হালাল ব্র্যান্ড পণ্য রয়েছে। দেশের ৬৬টি প্রতিষ্ঠান ৬০০টির বেশি পণ্য বা পণ্যের ক্যাটাগরি বিদেশে রপ্তানি করেছে। এসব পণ্য মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য বাজারে যাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে উৎপাদন সক্ষমতা আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি হালাল ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এখনো সীমিত।

জানা গেছে, প্রাণ তাদের ১৪৫টির বেশি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে। প্রতিষ্ঠানটি হালালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মান মেনে পণ্য উৎপাদনের কথা জানিয়েছে। এছাড়া  বোম্বে সুইটস হালাল পণ্য উৎপাদন করছে। বেঙ্গল বিস্কুটও হালাল সনদপ্রাপ্ত। এ ছাড়া খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অন্যান্য ভোক্তা পণ্যের দেশীয় প্রতিষ্ঠানও এই বাজারে যুক্ত হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের আলোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গত অর্থবছরে প্রায় ৯৪৩ মিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করেছে। অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হার ধরে প্রায় ১১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ঢাকা চেম্বারের এক আলোচনায়ও বলা হয়েছে, বিশ্ব হালাল বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে। সেখানে বাংলাদেশি হালাল রপ্তানি প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন বড় বাজার। এসব দেশে খাদ্য, মাংস, হিমায়িত খাবার, মসলা, বেকারি পণ্য ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা রয়েছে। দ্বিতীয় বড় সুযোগ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। মালয়েশিয়া বর্তমানে বিশ্ব হালাল অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর একটি।

২০২৪ সালের বৈশ্বিক বাজারে হালাল পণ্যের মধ্যে খাদ্য- ১.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলার, পোশাক- ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার, মিডিয়া ও বিনোদন: ২৭৬ বিলিয়ন ডলার, মুসলিম বান্ধব পর্যটন: ২৪৯ বিলিয়ন ডলার, হালাল ওষুধ: ১১২ বিলিয়ন ডলার, হালাল প্রসাধনী: ৯২ বিলিয়ন ডলার, এই ছয় খাত মিলে ২.৬০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করেছে।

বিশ্বের হালাল শিল্প নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, হালাল শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হলো মান নিশ্চিত করা, সনদ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মানের মধ্যে সমন্বয় করা।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের উৎপাদকদের অনেক সময় বাজার গবেষণা ও বিপণনের ঘাটতি থাকে। তার মতে, পণ্য থাকলেও কোন বাজারে কী চাহিদা রয়েছে, তা বুঝতে হবে। ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং উন্নত করতে হবে। বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ও দরকার।এটি হালাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু হালাল সনদ নিলেই বিদেশে বাজার তৈরি হবে না। পণ্যের মান, প্যাকেজিং, দাম, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্র্যান্ডিং ঠিক করতে হবে।

বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, বিশ্ব হালাল বাজার ট্রিলিয়ন ডলারের। সঠিক নীতি, সনদ ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এই শিল্পের বড় রপ্তানি খাত তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারও হালাল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো হালাল সনদ নীতিমালা চালু করা হয়। এর লক্ষ্য স্থানীয়ভাবে হালাল খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনী উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণে একটি কাঠামো তৈরি করা। 


টিএস

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝