রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় শুধু মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক বয়ানের বাইরে আরও কয়েকটি বিষয় তদন্তে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্বপুরুষের জমি কেনাবেচা নিয়ে বিরোধ, জমির অর্থ বণ্টন নিয়ে শরিকদের ক্ষোভ এবং সামাজিক দূরত্ব বা শ্রেণিগত ব্যবধান। তবে এসব কারণের কোনোটিকেই এখনো হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত কারণ হিসেবে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্তে নতুন কিছু বিষয় সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
এর আগে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতে শব্দ শুনে ছাদে উঠে গণপতি চক্রবর্তী দুই যুবকের ইয়াবা সেবন দেখে ফেলেন। এ কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে সিঁড়িতে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ছিল।
তবে পরে আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কিছু ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। পুলিশ কমিশনার নিজেই সংবাদ সম্মেলনে জানান, আগের বয়ানে শিশুটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যার কথা বলা হলেও আদালতের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, গণপতির ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থ দাসকে দেখতে পায়।
পুলিশ কমিশনারের দেওয়া আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, গণপতির মরদেহ ঢেকে পালানোর সময় তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ পেয়ে ছাদে চলে আসেন। তাঁরা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ গণপতির গামছা দিয়ে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরেন। একই সময়ে সিদ্ধার্থ দাস তাঁর মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী আগামীর গলা চেপে ধরেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে গামছা দিয়ে দুজন মিলে প্রার্থীর গলায় পেঁচিয়ে টান দেন। তাতেও তাঁর মৃত্যু না হলে পাশে কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে তাঁর গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়।
এরপর গণপতির ঘরে ঢুকলে তাঁর ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি তখন সিদ্ধার্থকে প্রশ্ন করে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’
পুলিশের দাবি, দেবুদের বাসার কেউ শব্দ শুনে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় আসামিরা শিশুটির গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও দুটি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পূর্বপুরুষের জমি কেনাবেচার প্রসঙ্গ এসেছে।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি পরিবারের কাছে ওই জমি তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছিল বলে একটি তথ্য পাওয়া গেছে। তবে জমির শরিকদের কেউ কেউ তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাননি—এমন অভিযোগ বা ক্ষোভও থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
তিনি বলেন, জমির টাকা আনুপাতিক হারে শরিকদের না পাওয়ার বিষয়টি তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তৈরি করেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে সামাজিক দূরত্বের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার।
তাঁর ভাষ্য, মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের হলেও গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে একটি ব্যবধান ছিল। রাস্তাঘাটে দেখা হলেও পারিবারিকভাবে নিয়মিত যাতায়াত ছিল না।
এই সামাজিক ব্যবধান থেকে কারও মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না, তদন্তে সেটিও দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চার হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, মামলার এজাহার, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত এবং ঘটনার সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে হত্যার সময়, আসামিদের চলাচল, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে তাঁদের পূর্বপরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশের বয়ানে পরিবর্তন থাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় গত শনিবার গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে এ ঘটনায় মামলা হয়। শুরুতে থানায় তদন্ত চললেও পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তদন্তকারীরা এখন মাদক সেবন, জমি কেনা-বেচা ও অর্থ বণ্টন নিয়ে সম্ভাব্য বিরোধ এবং সামাজিক দূরত্ব—এই তিনটি বিষয়সহ হত্যাকাণ্ডের অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
তবে এসব সম্ভাব্য কারণের কোনোটিকেই এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
এলওয়াই/আরএন