কলকাতার আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ ৯৬ ঘণ্টা পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারতীয় পুলিশ।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে মরদেহগুলো বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় সীমান্ত এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার মির্জাগালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় ‘শিখা ইন’ নামের আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে বাংলাদেশি সাত পাসপোর্টধারীসহ মোট নয়জন নিহত হন। নিহত অন্য দুজন ভারতের নাগরিক। এ ঘটনায় আরও আট পর্যটক আহত হন।
নিহত বাংলাদেশিরা কয়েক দিন আগে চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন। দেশে ফেরত আনা মরদেহগুলোর মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজন এবং ঢাকার একজন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন- আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), ছেলে শর্ণশীষ দত্ত (৩) ও শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০)। এ ঘটনায় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার রেবতী সরকার ও আলিমুজ্জামান সাজু এবং ঢাকার আহমেদ বাবুও নিহত হয়েছেন।
মরদেহ গ্রহণ করতে আসা নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের সহকর্মীরা জানান, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে তারা মির্জাগালিব স্ট্রিটের ওই আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছিলেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে কক্ষগুলো কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
স্বজন ও সহকর্মীদের অভিযোগ, হোটেলটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। ব্যস্ততম এলাকায় একটি বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই আবাসিক হোটেল পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। আশপাশে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ স্টেশন থাকা সত্ত্বেও হোটেলটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
নিহতদের স্বজনেরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলামিন সাগর বলেন, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে ওই পরিবারটি কলকাতার হোটেলটিতে অবস্থান করছিল। আগুন লাগার সময় তারা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। এ ঘটনায় হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
নিহত দেবাশীষ দত্তের আরেক সহকর্মী আনিসুর জামান ডাবলুও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।
বেনাপোল প্রভাতি সংঘের সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কলকাতায় যাতায়াত করেন। মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে পরিচালিত অবৈধ ও অনিরাপদ আবাসিক হোটেলগুলো বন্ধ করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের কলকাতা ডেপুটি হাইকমিশনার মো. খালেক জানান, নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আবু জাফর নামে এক হোটেল ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশ। পাশাপাশি কলকাতায় আটটি অবৈধ হোটেল শনাক্ত করে সেগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না এবং এর পেছনে কারও গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।
-টিএস