পশ্চিম ইউক্রেনের একটি সুরক্ষিত যুদ্ধবন্দী শিবিরে আটক রয়েছেন রাশিয়ার হয়ে নিজ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বহু সেনা। উঁচু দেয়াল, একের পর এক তালাবদ্ধ ফটক এবং কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা ওই শিবিরে রুশ নাগরিকদের পাশাপাশি রয়েছেন ইউক্রেনেরই কিছু নাগরিক, যারা রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কেন তারা নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, ওই শিবিরে গিয়ে তার বেশকিছু কারণ উদঘাটন করেছে বিবিসি।
আন্তন নামের এক যুদ্ধবন্দী ১০ বছর বয়সে দেখেছিলেন, তার পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চল মস্কোপন্থী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ২০২২ সালে রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করার সময় তার বয়স হয় ১৮ বছর। এরপরই সে রুশ বাহিনীতে যোগ দেয়।
আন্তনের ভাষ্য, সে নিজের ইচ্ছাতেই যুদ্ধে গিয়েছিল এবং নিজের ‘ভূমি রক্ষার’ জন্য লড়েছে। তার কয়েকজন বন্ধুও যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু পরে একের পর এক তাদের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। আন্তনের মতো আরও কয়েকজন বন্দী জানিয়েছেন, যাদের সঙ্গে তারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই মারা গেছেন।
আন্তন নিজেকে বিশ্বাসঘাতক মনে করেন না। বরং তার দাবি, তিনি নিজেকে রুশ মনে করেন। তার পরিবার ও শিকড় রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলেও জানান তিনি।
২০১৪ সাল থেকে রুশ নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনীয় অঞ্চলগুলোতে জন্ম নেয়া বা বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম রুশ শিক্ষা ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের প্রভাবের মধ্যে বড় হয়েছে। এসব মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কিয়েভের সরকারকে ‘নাৎসি’ ও অবৈধ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২২ সালের পর রুশ নিয়ন্ত্রণে আসা নতুন এলাকাগুলোতেও একই ধরনের প্রচার চালানো হচ্ছে।
আন্তন সেই প্রচারের প্রভাব থেকে বের হতে পারেননি। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘আমার প্রেসিডেন্ট’ বলে উল্লেখ করে এবং মনে করেন, পুতিনের ডনবাসের পুরো অঞ্চল দখল করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
ইউক্রেনের ডনেস্কের আরেক বাসিন্দা আর্তিয়মও স্বেচ্ছায় রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে মাত্র দুই মাস যুদ্ধ করার পর আহত হয়ে এখন যুদ্ধবন্দী শিবিরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শরীরজুড়ে রয়েছে বিস্ফোরণের স্প্লিন্টারের ক্ষত।
তার দাবি, রুশ বাহিনীতে যোগ দেয়ার পেছনে শুধু অর্থ নয়, ২০১৪ সালে ডনবাসে সংঘাতের সময়কার ক্ষোভও কাজ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধে গিয়ে তিনি হতাশ হয়েছেন। তার কমান্ডারকে তিনি ‘খারাপ’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং দাবি করেছেন, প্রতিশ্রুত ৪ লাখ রুবল যোগদানের অর্থও তিনি পাননি। অন্যদিকে তার পাশের শয্যায় থাকা এক আহত রুশ সেনা তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি অর্থ পেয়েছেন বলে জানান আর্তিয়ম।
রাশিয়ার হয়ে লড়াই করা সব ইউক্রেনীয়ই যে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, তা নয়। ডনেস্ক অঞ্চলের এক যুদ্ধবন্দী জানিয়েছেন, তাকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল।
কিছু গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে একটি হিসাবে দাবি করা হয়েছে, দখলকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চলের ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে জোরপূর্বক রুশ বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে। তবে অন্য কিছু হিসাব অনুযায়ী সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে।
ইউক্রেনের লুহানস্কে জন্ম নেয়া সের্গেইও রুশ বাহিনীর হয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার দাবি, তিনি নিজেকে রুশ মনে করেন এবং একসময় ‘নিজের মাতৃভূমি রক্ষার’ জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধ শেষে তিনি আর সম্মুখযুদ্ধে ফিরতে চান না।
অন্যদিকে কনস্টান্টিন নামে এক বন্দী জানান, দীর্ঘ কারাদণ্ড এড়াতেই তিনি রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। যুদ্ধে যোগ দিয়ে মুক্তির সুযোগ পাওয়াকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন।
যুদ্ধবন্দীদের একজন রুশ ও ইউক্রেনীয়দের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়টিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং উভয় পক্ষেরই একে অপরের দেশে আত্মীয়স্বজন আছে। তারপরও তিনি যুদ্ধে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করেন না।
বন্দীদের অনেকেই মনে করেন, পুতিন পুরো ডনবাসের নিয়ন্ত্রণ না পাওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামাবেন না। তবে তাদের নিজেদের পরিচিতদের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্তি বাড়ছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
ইউক্রেনের কাছে এসব যুদ্ধবন্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো রাশিয়ার সঙ্গে বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের সেনাদের ফিরিয়ে আনা। কিন্তু রুশ পক্ষের কাছে ডনবাস থেকে রাশিয়ার হয়ে লড়াই করা ইউক্রেনীয়দের অগ্রাধিকার তুলনামূলকভাবে কম বলে অভিযোগ করেছেন বন্দীরা।
এসএ