মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের গল্প শুধু দলীয় পদ-পদবি কিংবা নির্বাচনি রাজনীতির গল্প নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চা, শিক্ষকতা এবং ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তার অভিনয়ে কথা স্বীকার করেন। জানাগেছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মামাতো ভাই ছিলেন খ্যাতিমান চিত্রনায়ক রহমান (আবদুর রহমান)। এই চিত্রতারকা ও ঢাকাই সিনেমার নবাব’খ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন সঙ্গেও মঞ্চে অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। বিষয়টিকে ‘সৌভাগ্য’ বলেই মনে করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার কথায়, ‘তাদের সঙ্গে অভিনয় করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নাটক পরিচালনা করার সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল।’ শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গন নয়, ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে ক্রীড়া জগতেও সবসময় মাঠে থাকতেন তিনি।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্য। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি শৈশব-কৈশোর থেকেই সমাজ ও সংস্কৃতির নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি।
ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন মির্জা ফখরুল। সেখান থেকে অর্জন করেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শিক্ষা ক্যাডারের) এর সদস্য হিসেবে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে একজন সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি দায়িত্বের মধ্যে আলমগীর বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন, ১৯৮২ সালে এস.এ. বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে জনাব আলমগীর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে জনাব আলমগীরকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
পরাজয় পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হলেও থেমে যাননি মির্জা ফখরুল। ধারাবাহিকভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি হারালেও জাতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা থেমে থাকেনি। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর দলটির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে রাজপথ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
অবশেষে ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দলের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন তিনি।
এই পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রামের পথে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অসংখ্য চড়াই-উতরাই। দল যখন ভাঙনের মুখে, দল যখন সংকটে, তখন তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। সেই কঠিন সময়ে রাজপথ, আদালত প্রাঙ্গণ, সংবাদ সম্মেলন কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচি, সর্বত্র ছিল তার দৃঢ় উপস্থিতি। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলনে। নিজের হিসাব অনুযায়ী তিনি ১১ বার কারাবরণ করেছেন এবং প্রায় সাড়ে তিন বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। সংগ্রাম, ত্যাগ ও নিষ্ঠার দীর্ঘ অধ্যায়ের পর তিনি আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। আর এবার সক্রিয় রাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায় অতিক্রম করে তিনি অপেক্ষা করছেন তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মানের জন্য।
ব্যক্তিজীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ মির্জা ফখরুলের দুই কন্যাসন্তান। তারা উচ্চশিক্ষিত এবং শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।
তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যও উল্লেখযোগ্য। এক চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন সাবেক স্পিকার ও আইনমন্ত্রী। অন্য চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ছিলেন মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।