নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে মিশ্র চিত্র। একদিকে বেড়েছে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি খাতেও এসেছে কিছুটা গতি। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি, কর্মসংস্থানের সংকোচন এবং জ্বালানি সংকট অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
দুই দশক পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার অর্থনীতিতে সংস্কারের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে প্রথম ছয় মাসের চিত্র বলছে, বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনও আসেনি।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতির ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রবাসী আয় বৃদ্ধি। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কিছুটা কমেছে এবং অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি খাতেও সাময়িক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে। পাশাপাশি আমদানি প্রবণতা বাড়ার বিষয়টিকেও অর্থনীতিবিদরা সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে।
বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তির বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চিত্র বেশ নাজুক। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ঐতিহাসিকভাবে নিচের দিকে। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, বর্তমানে তা অর্ধেকেরও নিচে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এটি অন্যতম নিম্ন প্রবৃদ্ধি।
ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে। নতুন বড় শিল্পকারখানা স্থাপনের গতি কমেছে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। আবাসন ও নির্মাণ খাতেও স্থবিরতা কাটেনি।
ফলে অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বদলে বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও ডলারের বাজারে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফেরেনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ধরে রাখতে হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা হয়ে রয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পে এর প্রভাব বেশি। উৎপাদন ব্যাহত হলে একদিকে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও কমছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, সহজ ঋণ, স্থিতিশীল নীতি ও ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলে সরকারের রাজস্বভিত্তিও শক্তিশালী হবে। এ জন্য কাঠামোগত সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সীমিত রাখছেন এবং নতুন বিনিয়োগকারীরাও সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ ভবিষ্যতে সরকারের ওপর ঋণের চাপ বাড়াতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি এলেও এর সুফল এখনো পুরোপুরি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের ইতিবাচক প্রবণতাকে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করাই এখন সরকারের বড় পরীক্ষা।
অর্থনীতির গতি ফেরাতে হলে বেসরকারি ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগে আস্থা তৈরি, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আগামী ছয় মাসে সরকার এসব চ্যালেঞ্জ কতটা মোকাবিলা করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতি।
এসএফ