দীর্ঘ চার বছর পর বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা তাদের অবসর সুবিধার জমানো টাকার একটি অংশ পেয়েছেন।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের প্রাপ্য অর্থ ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজকের অনুষ্ঠানটি কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। ২০২২ সালের পর দীর্ঘ চার বছর ধরে আটকে থাকা অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকার জীবনে কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধার জন্য দুটি তহবিল রয়েছে। এর একটি ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং অন্যটি ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব তহবিলে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিমাসে টাকা জমা দেন। এর সঙ্গে সরকারও প্রতিটি হিসাবের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে অর্থ জমা করে। দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার সময় প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকা যাতে একটি ভালো অঙ্কের টাকা হাতে পান, সেটিই ছিল এর উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কল্যাণে তার উদ্যোগেই ১৯৯১ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং ২০০২ সালে ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি এসব তহবিলে সরকারি ফান্ড থেকে প্রথমে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন এবং পর্যায়ক্রমে ৮৯ কোটি টাকার ফান্ড গঠন করে এর সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন।
তারেক রহমান বলেন, খালেদা জিয়া বরাবরই শিক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। বিশেষ করে নারীদের একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে তার উদ্যোগ ও ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। শিক্ষা বিস্তারে খালেদা জিয়ার চালু করা ‘শিক্ষা উপবৃত্তি এবং নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মডেল হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মহান আল্লাহর দরবারে মরহুমা খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা করছি।’
অবসর সুবিধার অর্থ পেতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উদ্দেশ্য মহৎ হলেও চাকরিজীবন শেষে অবসরে গিয়ে নিজেদের টাকা তুলতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এমনকি নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অলিখিত নিয়মও চালু হয়ে গিয়েছিল বলে মনে হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, এবার কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাপ্য টাকা তাদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষক সমাজ নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের বাণী শিখিয়ে লাখো-কোটি শিক্ষার্থীকে বড় করে তোলেন। সেই শিক্ষকদেরই যদি ঘুষ দিয়ে নিজেদের টাকা তুলতে হয় কিংবা অফিসে অফিসে ঘুরে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তাহলে সেটি শুধু শিক্ষকদের হয়রানি নয়, জাতি হিসেবে আমাদের ‘দীনতা-হীনতা’ প্রকাশ করে।
তবে অবসর সুবিধার টাকা সহজে শিক্ষকদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, ‘পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী সরকার’ ব্যাংক-বীমাসহ প্রতিটি খাত থেকে লুটপাট করেছিল। সেই লুটপাটের কবল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্বার্থে গঠিত দুটি তহবিলও রেহাই পায়নি।
তিনি বলেন, জাল ইনডেক্স তৈরি, লুটপাটের সুযোগ তৈরির জন্য শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ধ্বংস করার মাধ্যমে তহবিল দুটিকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল।
এর ফলে সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে জীবনের সোনালি সময় পার করা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফ্যাসিবাদী চক্রের লুটপাটের কারণে ২০২২ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা এসব তহবিল থেকে কোনো টাকা পাচ্ছিলেন না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবসরকালীন সুবিধার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানান তারেক রহমান। কিন্তু তখন দেখা যায়, দুটি তহবিলেই পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ৭০ হাজারের বেশি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকার দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থায় তাদের টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতদিন বর্তমান নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, ততদিন অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। তাদের যাতে আর কোনো ভোগান্তি পোহাতে না হয়, সে চেষ্টা সরকারের থাকবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর যন্ত্রণাও তাদের সহ্য করতে হবে না।
তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে যথাসময়ে অনলাইনে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাপ্য টাকা কোনো ভোগান্তি ছাড়াই তাদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যাবে, ইনশা আল্লাহ।
অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অবসর-পরবর্তী ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে, শিক্ষকতা হলো একমাত্র পেশা, যা অন্য সব পেশার সৃষ্টি করে। শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিলেও তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। এখানেই একজন শিক্ষকের সার্থকতা।
তারেক রহমান বলেন, প্রচলিত নিয়মে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিলেও শিক্ষক হিসেবে তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। তারা এখনো সমাজের শিক্ষক। বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জনমানসে তাদের ভূমিকা সর্বজনগ্রাহ্য।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা সমাজে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবেন-এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।
টিআইএস