ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
গুরুদাসপুরের বৃহৎ কলার হাটে কোটি টাকার বেচাকেনা, তবু নেই স্থায়ী অবকাঠামো
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৪ পিএম
X

ভোরের আলো ফোটার আগেই নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুরের ঐতিহ্যবাহী কলার হাট প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। ছোট ভ্যান, ট্রলি, লছিমন-করিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কলা নিয়ে আসেন হাটে। সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে কলার কাঁদি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ফরিয়া ও মহাজনদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ভোররাত থেকেই কলা কাটা, বাছাই, পরিবহন ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত থাকেন কৃষক-কৃষাণীরা।

প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো এ হাটে নাটোরের বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীরা কলা কিনতে আসেন। বেচাকেনা শেষে ট্রাকযোগে এসব কলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। শুক্র ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহের নির্ধারিত দিনগুলোতে বসা এ হাট এখন চলনবিল অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কলা বিপণনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল হতেই শুরু হয় জমজমাট বেচাকেনা। কেউ কাঁদি সাজাচ্ছেন, কেউ ট্রাকে তুলছেন, আবার কেউ দাম নিয়ে দরকষাকষিতে ব্যস্ত। পুরো হাটজুড়ে বিরাজ করছে কর্মচঞ্চল পরিবেশ।

নাজিরপুর হাটের ইজারাদার নজরুল ইসলাম জানান, গুরুদাসপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের পাশাপাশি সিংড়া ও বড়াইগ্রাম থেকেও বিপুল পরিমাণ কলা এ হাটে আসে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ ট্রাক কলা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। জাত, আকার ও গুণগত মানভেদে প্রতি কাঁদি কলার দাম ৩০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে।

প্রতি কাঁদিতে সাধারণত ৭০ থেকে ৯০টি কলা থাকে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, হাটটিতে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার কাঁদি কলা কেনাবেচা হয়। গড়ে প্রতি কাঁদি ৭০০ টাকা দরে হিসাব করলে, প্রতিদিন এ হাটে প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১৪ লাখ টাকা মূল্যের কলা বেচাকেনা হয়। সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে কলার দাম কিছুটা কমবেশি হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নাজিরপুর হাটে তুলনামূলক কম খরচে ভালো মানের কলা পাওয়া যায়। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সরবরাহ করাও সম্ভব হয়। প্রতি কাঁদির জন্য মাত্র ৫ টাকা ইজারা দিতে হয় বলেও জানান তারা।

কলাচাষিরা বলছেন, বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের উপস্থিতির কারণে এখানে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে অনেক সময় অন্যান্য বাজারের তুলনায় ভালো দাম পাওয়া যায়।

বিয়াঘাট ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের কলাচাষি আমিনুল ইসলাম লিটন জানান, মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে কলা চাষ করে তিনি লাভবান হয়েছেন। একবার চারা রোপণ করলে তিন থেকে চার মৌসুম পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। এ বছর ৪০ বিঘা পুকুরপাড়ে কলা চাষ করে খরচ বাদে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, এ বছর তিনি ১০ বিঘা জমিতে সাগর, অমৃতসাগর ও মেহেরসাগর জাতের কলার চারা রোপণ করেছেন। প্রতি বিঘায় ৩০০ থেকে ৪০০টি চারা লাগানো যায় এবং প্রায় এক বছরের মধ্যেই ফলন পাওয়া সম্ভব। তাঁর সফলতা দেখে অন্য কৃষকরাও কলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

বিলচন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজের প্রভাষক ও কৃষিবিদ জহুরুল হক সরকার বলেন, এ অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত উর্বর। ধানের পাশাপাশি তরমুজ, বাঙ্গি, লিচু, আম ও কলার ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকেরা এখন ফলচাষে ঝুঁকছেন।

হাটের বর্তমান ইজারাদার মো. রনি হোসেন বলেন, নাজিরপুরের এ কলার হাট চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপণনকেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে কলা সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫টি ট্রাকে কলা দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।

তবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ হাটে স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ভাড়া নিয়ে হাট পরিচালনা করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পানি জমে কাদার সৃষ্টি হওয়ায় কলাবোঝাই ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি সড়কের ওপর হাট বসায় সৃষ্টি হয় যানজট।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, নাজিরপুর কলার হাট শুধু গুরুদাসপুরের অর্থনীতিতেই নয়, চলনবিল অঞ্চলের হাজারো কৃষকের জীবিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই হাটটির জন্য স্থায়ী জায়গা নির্ধারণ এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। সেই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন, সড়ক উন্নয়ন ও সহজ যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান বলেন, এ বছর উপজেলায় প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে কলার চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাজিরপুরের এ ঐতিহ্যবাহী কলার হাটকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

এমএ/আরএন

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝