পটুয়াখালী জেলায় ২ হাজার ৭৯০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি পৃথক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে রেশনিংয়ের কারণে কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় প্রতিদিনই লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জেলাবাসীকে।
পটুয়াখালী জেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীর নিশানবাড়িয়া মৌজায় নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (বিসিপিসিএল)। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট করে মোট ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে থাকে।
এছাড়া কলাপাড়ার ধানখালীর লোনদা মৌজায় আরএনপিএল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে মোট ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে থাকে। পাশাপাশি পটুয়াখালী শহরের নিকটবর্তী নদীর অপর পাড়ে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
এদিকে পটুয়াখালীতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
পটুয়াখালী গ্রিডের দায়িত্বে থাকা বরিশাল পাওয়ার গ্রিডের বরিশাল ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আখতারুজ্জামান পলাশ জানান, সময়ভেদে পটুয়াখালী জেলায় ১০০ থেকে ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আজ বিকেল ৪টা পর্যন্ত পটুয়াখালী গ্রিডে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কাশেম জানান, পটুয়াখালী জেলায় দিন-রাত মিলিয়ে ৭০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। দিনের বেলা চাহিদা কম থাকলেও রাতে চাহিদা বেড়ে যায়। অনেক সময় তা ১২০ থেকে ১৩০ মেগাওয়াট পর্যন্তও পৌঁছে যায়। চাহিদার তুলনায় তারা সময়ভেদে প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পেয়ে থাকেন।
পটুয়াখালী শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক হোসেন জানান, পিক আওয়ারে পটুয়াখালী শহরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে তারা পাচ্ছেন ৮ মেগাওয়াট। এ কারণে পটুয়াখালী পৌরবাসীকে বিদ্যুৎ সংকটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে পটুয়াখালী পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের (বিসিপিসিএল) প্ল্যান্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী শাহ আবদুল হাসিব জানান, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরের নাব্যতা সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে মাদার ভেসেল আসতে পারছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জটিলতার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, ৬০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মাদার ভেসেল নাব্যতা সংকটের কারণে এখন আর সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে আসতে পারছে না। কুতুবদিয়ায় মাদার ভেসেল থেকে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার লাইটার জাহাজে করে কয়লা পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে জাহাজের ভিড় বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
ক্যাপিটাল ড্রেজিং না হওয়ায় বর্তমানে মাসে ৩০ থেকে ৫০টি লাইটার জাহাজে করে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। ১০ আগস্ট পর্যন্ত পটুয়াখালীতে পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক নদীতে নাব্যতা ৪ থেকে সাড়ে ৫ মিটার থাকায় এ জটিলতা দিন দিন বাড়ছে।
শাহ আবদুল হাসিব আরও জানান, মাদার ভেসেল সরাসরি উৎপাদনকেন্দ্রের জেটিতে আসতে না পারায় ঝুঁকি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন কয়লা মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে এক থেকে দেড় মাস চলবে। একটি মাদার ভেসেল সরাসরি জেটিতে আসতে পারলে সর্বোচ্চ দুই দিনের মধ্যে সব কয়লা খালাস করা সম্ভব। কিন্তু লাইটার জাহাজে করে মাদার ভেসেল থেকে কয়লা খালাস করে জেটিতে আনতে ৭ থেকে ৮ দিন সময় লেগে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, যত দ্রুত পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে বন্দরকে মাদার ভেসেল আসার উপযোগী করা যাবে, তত দ্রুত এ ভোগান্তি কমবে।
তিনি আরও বলেন, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে চলে যাচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও তা স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। জাতীয় গ্রিড থেকে রেশনিংয়ের মাধ্যমে সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
এদিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আরেকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আরএনপিএলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আশরাফ উদ্দিন জানান, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তারা সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছেন।
তিনি জানান, নাব্যতা সংকটের কারণে তাদেরও কুতুবদিয়ায় মাদার ভেসেল রেখে সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে কয়লা আনতে হচ্ছে।
জেএইচ/আরএন