নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিতর্কিত উপস্থিতি নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির সমীকরণে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে হঠাৎ করেই গতি পেয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা। টানা কয়েক দিনের উচ্চপর্যায়ের প্রকাশ্য বৈঠক, গোপন সফর এবং তড়িঘড়ি বার্তা আদান-প্রদান প্রমাণ করে, বিদ্যমান জটিলতা কাটিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশই আলোচনা ও সমঝোতার টেবিলে চোখ রাখছে।
গত কয়েক দিনে ঢাকায় অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন ভারতের ১৬তম হাইকমিশনার ও প্রবীণ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি রোববার স্টেট গেস্ট হাউস পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এর পরদিন সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। একই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পৃথক বৈঠক করেন ভারতীয় দূত। পরপর তিনটি নীতিনির্ধারণী বৈঠকের পর কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য ছাড়াই সোমবার বিকেলে জরুরি ভিত্তিতে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অবস্থান ও মনোভাব সরাসরি নিজ দেশের সদর দপ্তরে পৌঁছাতেই এই তড়িঘড়ি সফর বলে ধারণা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হাইকমিশনারের এসব রাজনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে ‘সিকিউরিটি ডিপ্লোমেসি’ বা নিরাপত্তা কূটনীতি। প্রকাশ্যে বৈঠকের আবহেই ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় পৌঁছায়। যদিও সফরটি নিয়ে ঢাকা বা দিল্লি কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি, তবে সীমান্ত নিরাপত্তা, স্পর্শকাতর তথ্য বিনিময় এবং দুই দেশের চলমান উত্তেজনার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন রূপরেখা তৈরিতেই এই ঝটিকা সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য আসামিদের অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর জোর দাবি জানানো হয়েছে ভারতকে। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকারীদের প্রত্যার্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধও রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে।
অন্যদিকে, আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সেখানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী অবশ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব একসঙ্গে বসলে এবং সরাসরি আলোচনা হলে বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব। দুই পক্ষই পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা এবং একে অপরের সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এগোতে চাইছে। ফলে ঢাকায় ব্যাকচ্যানেল ও ফ্রন্টচ্যানেলের এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলোকে দুই দেশের মধ্যকার জমে থাকা বরফ গলানো এবং সম্পর্কের ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর একটি জোরালো চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।