বাসাবাড়ির রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাস্তার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও বৃহৎ শিল্পকারখানা—আজও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত রয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট।
দীর্ঘদিন যাবৎ চলা এই ভোগান্তি চলতি সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে এসে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বাসাবাড়িতে যেমন রান্নাবান্না থমকে গেছে, তেমনি পাম্পগুলোতে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় দিন পার করছেন চালকেরা। অন্যদিকে সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতেও, সেখানে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক উৎপাদন।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা ও উত্তরাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়—আবাসিক চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিক রান্না করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাড্ডার বাসিন্দা নাজনীন বলেন, “গ্যাসের চাপ একেবারেই কম, লাইনে যে পরিমাণ গ্যাস আসে তাতে রান্না করতেই দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে এখন চুলা ছেড়ে বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে।”
এদিকে খিলগাঁও এলাকার গৃহিণী আইরিন সুলতানা তার দৈনন্দিন কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, “আজ ১০ আগস্ট হয়ে গেল, কিন্তু গ্যাসের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার আগে নাস্তা তৈরি করা তো দূরের কথা, এক কাপ চাও বানানো যায় না। সকাল ৬টা বাজতেই নিভে যায় চিলতে আগুনটাও। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে অল্প একটু চাপ আসে, তা-ও মিটমিট করে জ্বলে। বাধ্য হয়ে রাতের ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দুই বা একদিনের রান্না একসঙ্গে করে রাখতে হয়। সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্যও সবার প্রতিদিন থাকে না।”
সংকটের কারণে গৃহস্থালি সামলাতে অতিরিক্ত খরচে এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক হিটার ও রাইস কুকার ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এতে একদিকে যেমন সংসারের মাসিক বাজেট লাল দাগ স্পর্শ করছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপরও তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত লোড।
অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেখা গেছে যানবাহনের কিলোমিটার-জোড়া দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বহু চালক পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে খালি হাতেই ফিরছেন।
আজ দুপুরে রাজধানীর পান্থপথের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকা অটোরিকশাচালক জাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা মালিককে জমা দিতে হয়। পাম্পের লাইনে দাঁড়াতেই যদি দিনের সাড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা চলে যায়, তবে যাত্রী পাব কখন আর আয়-ই বা করব কীভাবে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে যেটুকু গ্যাস পাই, তা দিয়ে অর্ধেক দিনও চলে না। ট্রিপ মারতে না পেরে কিস্তির টাকা শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”
একই অবস্থা দেখা গেছে লালবাগের ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আজাদের ক্ষেত্রেও। তিনি বলেন, “পাম্পে গ্যাস পাই না, সিরিয়ালে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গ্যাস নিতেই আমাদের দিনের অধিকাংশ সময় পার হয়ে যায়, যে কারণে আমার নির্ধারিত কাজ সময় মতো করতে পারি না।
শিল্পাঞ্চলগুলোতেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে গ্যাসচাপ তলানিতে নামায় বয়লার চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, অধিকাংশ কারখানায় এখন অর্ধেকের কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো হচ্ছে। যথাসময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পণ্য পাঠাতে না পারলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে দেশ।
সংকটের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি পুনারূপান্তর টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে মূল সরবরাহ হঠাৎ অনেকটাই কমে গেছে। আজ ১০ আগস্ট পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ শুরু হতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। ফলে আবাসিক, পরিবহন ও শিল্পখাত—সব মিলিয়ে এই ত্রিমুখী ভোগান্তি চলতি সপ্তাহেও বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এসএ