ঢাকা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই প্রতিষ্ঠানটিতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি নির্মূল, পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানটিকে টেকসই আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সাবেক সচিব মো. আমিনুল ইসলাম।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূরীকরণ, অপচয় রোধ এবং ঢাকা শহরবাসীকে উন্নত পানি সেবা পৌঁছে দিতে একাধিক প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসার ভবনে দ্য ডেইলি অবজারভারকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্নীতি তদন্ত, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার, পানির মান, আর্থিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।
প্রশ্ন: বিগত প্রশাসনের সময়কার দুর্নীতি ও অনিয়ম সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
মো. আমিনুল ইসলাম: সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার একটি লাভজনক ও দক্ষ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পূর্ণ সুযোগ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বিগত সময়ে জনস্বার্থ ও সরকারের স্বার্থ সঠিকভাবে রক্ষিত না হওয়ায় সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রমে ধস নামে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিগত ব্যবস্থাপনার নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করছে। যেহেতু দুদক একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, তাই আমরা প্রয়োজনীয় সব নথি ও তথ্য সরবরাহ করে পূর্ণ সহযোগিতা দিচ্ছি। এছাড়া আমরা নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কাজও চালিয়ে যাচ্ছি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তিসাপেক্ষে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশ্ন: বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দাশেরকান্দি পয়েন্ট শোধনাগারটি দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর পড়ে ছিল। বর্তমানে এর হালনাগাদ পরিস্থিতি কী?
মো. আমিনুল ইসলাম: এ প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েও দুদক তদন্ত করছে। বাংলাদেশ সরকার, ঢাকা ওয়াসা এবং চীন এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৩,৪৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে দাশেরকান্দি পয়েন্ট শোধনাগার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ঢাকার পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এটি নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক ও ড্রেনেজ লাইন তৈরি না হওয়ায় কারখানাটি এতদিন কার্যকর করা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি, যাতে প্ল্যান্টটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়। আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা এ কাজ সম্পন্ন করতে পারব।
প্রশ্ন: সম্প্রতি কয়েকজন গবেষক দাবি করেছেন যে ঢাকা ওয়াসার পানিতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মো. আমিনুল ইসলাম: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে ঢাকা ওয়াসা নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে নিয়মিত পানি পরীক্ষা করে থাকে। আমাদের রুটিন পরীক্ষায় পানির উৎসে ক্ষতিকর বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী কোনো উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। উচ্ছেদ বা সরবরাহ পয়েন্টে আমাদের পানি শতভাগ নিরাপদ। তবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দাবির বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি এবং ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন: কিছু কিছু এলাকার বাসিন্দারা এখনো পানির নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ করছেন।
মো. আমিনুল ইসলাম: মিরপুর, মনিপুর ও কাফরুলের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় পানি সরবরাহে সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সমস্যা পানির উৎসগত নয়, বরং বিতরণ নেটওয়ার্কের ত্রুটির কারণে ঘটছে।
আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি, তবে একা ওয়াসার পক্ষে তা সম্ভব নয়; নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। কিছু কিছু এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাধার কারণে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় অংশীজনদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এসব বাধা অতিক্রম করে ব্যবস্থার উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।
প্রশ্ন: নিজস্ব বোতলজাত পানি ‘শান্তি’ বিক্রি করে ওয়াসা লোকসানের মুখে পড়েছে বলে খবর এসেছে। এ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
মো. আমিনুল ইসলাম: ‘শান্তি’ মানসম্মত একটি বোতলজাত পানি এবং বাণিজ্যিকভাবে এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এর সরবরাহ বাড়িয়ে পানির এই ব্র্যান্ডটিকে লাভজনক করাই আমাদের লক্ষ্য। এর জন্য দুটি বিশেষজ্ঞ কমিটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক কৌশল তৈরিতে কাজ করছে। অতীতে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে ‘শান্তি’ পানি বিতরণ করা লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। আমরা এই নীতি পুনর্বিবেচনা করছি।
প্রশ্ন: ঢাকায় পানির বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহের পরিস্থিতি কেমন?
মো. আমিনুল ইসলাম: বর্তমানে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে। নগরে দৈনিক প্রায় ৩২৫ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে ওয়াসা এখন ৩০০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে। পুরাতন ও পরিত্যক্ত কেন্দ্রগুলো সংস্কারের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছি।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতের পানি সংকট মেটাতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
মো. আমিনুল ইসলাম: ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে আমরা ভূ-উপরিস্থ (সারফেস) পানির ব্যবহার বাড়াচ্ছি।
মেঘনা নদী থেকে পানি এনে গুলশান, বনানী ও বাড্ডা এলাকায় সরবরাহের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি সায়েদাবাদ শোধনাগারের ১ম ও ২য় পর্বে পানি শোধন ব্যয়বহুল হওয়ায় পদ্মা নদীর পানিকেও সিস্টেমে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মেঘনা প্রকল্প থেকে মোট ৯৫ কোটি লিটার পানি আসবে, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৪৫ কোটি লিটার পানি গুলশান, বনানী ও বাড্ডা অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: পরিবেশগত শর্ত অনুসরণে উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্বেগের বিষয়ে ওয়াসা কী ভূমিকা রাখছে?
মো. আমিনুল ইসলাম: পরিবেশ দূষণ কমাতে উন্নয়ন সহযোগীরা বারবার তাগিদ দিচ্ছে। পরিবেশগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই পরিবেশ সুরক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণকে আমরা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
প্রশ্ন: এছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রগুলোতে সংস্কারের জোর দিচ্ছেন?
মো. আমিনুল ইসলাম: প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা আমাদের মূল লক্ষ্য। অবৈধ সংযোগ এবং বিল জালিয়াতি বন্ধ করে রাজস্ব ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, আগের প্রশাসনের সময় হওয়া অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ পর্যালোচনার কাজ চলছে, যাতে জনঅ অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো ঢাকা ওয়াসাকে একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ ও সেবামুখী পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
এমকে/এসএ