দিন-রাত অবিরত ভেসে আসছে বিকট গুলির শব্দ। সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ঘেঁষা জনপদে নেমে আসে থমথমে আতঙ্ক। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র চক্রের একের পর এক অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখন থমকে গেছে। চরম নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণভয়ে ইতোমধ্যে এই দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে গেছে। গৃহস্থালি বাঁচাতে অনেকে দিনে বাড়িতে থাকলেও রাত নামার আগেই ছুটছেন দূর-সম্পর্কীয় আত্মীয়দের বাড়ি বা শহরের ভাড়া বাসায়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জীবন ও নিরাপত্তার শঙ্কায় ভুগছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের এই দুর্গম সীমান্ত জনপদে গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত ঘটছে এমন তাণ্ডব। সম্প্রতি গত ১৭ জুলাই বাহারছড়ার উত্তর নয়াপাড়া এলাকা থেকে ১২ বছরের শিশু মো. আরাফাতকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পাহাড়ে নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। পরে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে পরিবার। এর আগে ২৮ জুন নোয়াখালী জুম্মাপাড়ায় দিনদুপুরে এক বাড়িতে ঢুকে পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে (৬৫) অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা, যার সন্ধান মেলেনি আজ অবধি। হোসেন আলী নামে আরেক বাসিন্দাও মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে বাড়ি ফেরেন। একের পর এক এসব ঘটনায় আতঙ্ক এখন কাটছেই না।
নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকের জানান, ভিটেমাটিতে নিরাপত্তা না থাকায় স্ত্রী-সন্তানদের শহরের ভাড়া বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে তিনি দিনে শুধু ভিটে পাহারা দেন এবং রাতে অন্য জায়গায় গিয়ে ঘুমান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের দেয়া পরিসংখ্যান বলছে, টেকনাফের পাহাড়ভিত্তিক অপরাধ এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল সিন্ডিকেটে। গত তিন বছরে এ অঞ্চল থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত এক বছরেই ১৫টি পৃথক ঘটনায় প্রায় ১৫৫ জনকে পাহাড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের মধ্যে ৯৬ জনই রোহিঙ্গা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোটা অঙ্কের টাকা ও সোনাদানা মুক্তিপণ হিসেবে গুনে জীবন বাঁচাতে পেরেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে সবাই যে ভাগ্যবান, তা নয়। গত মে মাসে অপহরণে বাধা দেওয়ায় শহীদ উল্লাহ (১৯) নামের এক তরুণকে গুলি করা হয় এবং এপ্রিলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান সুমাইয়া নামের এক তরুণী। তা ছাড়া সম্প্রতি পাহাড়ি এলাকা থেকে একাধিক বস্তাবন্দি খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ, যা ভয়ের মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো জনপদ জনশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের প্রায় ৫০০ পরিবারের পুরো জনপদ আজ আতঙ্কের ঘরবাড়ি। ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার ইতোমধ্যে তালা ঝুলিয়ে গ্রাম ছেড়েছে। অবস্থা এমন যে, জনপ্রতিনিধি হয়েও আমি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবছি। দ্রুত যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযান না চালালে এই পাহাড়ি এলাকা পুরোপুরি মানুষশূন্য হয়ে যাবে।’ ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকনও একই আশঙ্কা প্রকাশ করে অনতিবিলম্বে বড় পরিসরে উদ্ধার ও যৌথ অভিযানের দাবি জানিয়েছেন।
ভীতি কাটিয়ে জনপদে স্বস্তি ফেরাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে পরিচালিত এই অপহরণ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে খুব দ্রুত বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হবে এবং এলাকায় স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানান, পাহাড়ি এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা ও অপহরণ বন্ধে বড় ধরনের যৌথ অভিযানের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে মোবাইল টিম টহল বাড়িয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে টেকনাফের পাহাড়ি সীমান্ত এলাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করা হবে।
এসএ