বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল দক্ষিণ কোরিয়া সফর করে সিইপিএ নিয়ে চূড়ান্ত দফার আলোচনা সম্পন্ন করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আজ শেষ দফার আলোচনা করবে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে টেলিফোনে সিইপিএ নিয়ে আলোচনা করেন দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য, শিল্প ও জ্বালানি (সম্পদ) মন্ত্রী কিম জং-ক্বান। দুই দেশের মধ্যে এ আলোচনা ইতিবাচক ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিইপিএর আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানিযোগ্য বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারসহ বেশ কিছু সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চুক্তির চারটি বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। বাকি আটটি বিষয়ে শেষ মুহূর্তের আলোচনা চলছে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও এ সুবিধা বহাল রাখা, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যকে রুলস অব অরিজিন–এর আওতায় রাখা এবং আইটি, প্রকৌশল, আর্থিক সেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা খাতে বাজারে প্রবেশের সুযোগও আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাংলাদেশে কোরিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্য দ্রুত ছাড়, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা চালু, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের (ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি) আওতায় পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট সুরক্ষা এবং চুক্তি বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ এখনো তুলনামূলক ছোট হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হয় প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক (নিট ও ওভেন), হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং সিরামিক পণ্য। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা হয় লোহা ও ইস্পাত, যন্ত্রপাতি ও শিল্প মেশিনারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য, রাসায়নিক পদার্থ এবং কাগজ ও কাগজজাত পণ্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির পর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সিইপিএ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে এ চুক্তি নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। তাঁর মতে, সিইপিএ কার্যকর হলে ইলেকট্রনিকস, মবিলিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেক্সটাইল ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, আমরা কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছি। শুল্ক, রেমিট্যান্স ও কর-সংক্রান্ত যেসব বিষয় তারা তুলে ধরেছেন, সেগুলো আরও সহজ, দ্রুত ও আধুনিক করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। বর্তমান সরকার জানিয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও ছয়টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
-সুমন/টিএস