মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ পাঁচ দিনের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে লোডশেডিং, আর রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গৃহস্থালি, শিল্প ও সিএনজি খাতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ প্রতিবেদন এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০ জুলাই যেখানে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে দৈনিক প্রায় ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল, ২৫ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় ৫০ কোটি ১১ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দিনে এলএনজি সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৯ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট বা প্রায় ৫০ শতাংশ।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ ২৬৪ কোটি ১ লাখ ঘনফুট থেকে নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ১৭ লাখ ঘনফুটে। সরকারি হিসাবে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। ২০ জুলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ৯২ কোটি ৬৮ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ২৫ জুলাই তা কমে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ঘনফুটে নেমে আসে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়।
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলেও চাহিদার পুরোটা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ২৫ জুলাই রাত ১১টায় সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়, যা পাঁচ দিন আগের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয়ও বেড়েছে। ২০ জুলাই প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৬ টাকা ৩১ পয়সা, যা ২৫ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭ টাকা ৯ পয়সায়।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে। পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিতাসের গ্যাস বিতরণ কমেছে প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট। ফলে রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না করতে পারছেন না বাসিন্দারা। অনেকেই বাধ্য হয়ে বিদ্যুচ্চালিত চুলা ব্যবহার করছেন, এতে বাড়ছে বিদ্যুৎ বিলও।
পাওয়ার গ্রিডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৬ জুলাইয়ের জন্য ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিট গ্যাস সংকটের কারণে এবং আরও ৩৩টি কেন্দ্র তরল জ্বালানির সংকটে সীমিত উৎপাদনে ছিল। এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও বন্ধ রয়েছে।
এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে এ বছরের সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। তারপরও চাহিদার পুরোটা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না বলে কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ থাকা এলএনজি টার্মিনাল থেকে আগামী সপ্তাহে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রথম ধাপে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, গ্যাস সংকটে গৃহস্থালি, শিল্প ও সিএনজি খাতের ভোগান্তির বিষয়টি সরকার অবগত। এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সমস্যা হলেও জনগণের দুর্ভোগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
-টিএস