সাপ্তাহিক ছুটির শেষ বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিল ভিন্ন এক আবহ। উপাচার্যের বাসভবনের বিপরীত পাশ থেকে কলাভবন ও রেজিস্ট্রার ভবনের মাঝের সবুজ পথজুড়ে পরিবার, বন্ধু আর শিশুদের পদচারণায় মুখর ছিল পরিবেশ। কিন্তু সেই স্বস্তির মুহূর্তেই এক নারীর উদ্বিগ্ন প্রশ্ন যেন বাস্তবতার কঠিন চিত্র সামনে এনে দেয়—‘এ পানিতে ডেঙ্গুর মশা নেই তো?’
তার সামনে জমে থাকা বৃষ্টির স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে করা প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত উদ্বেগ নয়; বরং এখন পুরো দেশেরই এক বড় আশঙ্কার প্রতিচ্ছবি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিষ্কার ও স্থির পানিই এডিস মশার সবচেয়ে উপযোগী প্রজননস্থল। আর টানা বর্ষণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হওয়া অসংখ্য ছোট-বড় জলাবদ্ধতা ডেঙ্গুর বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জুলাইয়ে ডেঙ্গুর বিস্ফোরণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি জুলাই মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
২৬ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ২৬ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৯৯৪ জন ডেঙ্গু রোগী। অথচ জুন মাসে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যাও একইভাবে বাড়ছে। জুনে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৩ জন। আর জুলাইয়ের প্রথম ২৬ দিনেই মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে মারা গিয়েছিলেন মাত্র পাঁচজন। অর্থাৎ জুন ও জুলাই—মাত্র দুই মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ৩৮ জন।
জানুয়ারিতে আক্রান্ত ছিলেন ১ হাজার ৮১ জন, মৃত্যু হয়েছিল মাত্র দুজনের। সেই তুলনায় জুলাইয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ১২ গুণের বেশি, আর আক্রান্ত বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি।
সামনে আরও কঠিন সময়ের আশঙ্কা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা অব্যাহত থাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তাদের ভাষ্য, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস এবং বৈজ্ঞানিক মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার না হলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে।
সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, গত দুই বছরের তুলনায় এ বছর এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। বিষয়টি সিটি করপোরেশনকে জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
তার মতে, এডিস ও কিউলেক্স মশার জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সারা বছর কাজ করতে হবে। শুধু মৌসুমি অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর উপসর্গ
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, বর্তমানে ডেঙ্গুর লক্ষণেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে কয়েক দিন উচ্চমাত্রার জ্বরের পর রোগীর অবস্থা খারাপ হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে এক-দুদিনের মধ্যেই জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক রোগীর আবার তীব্র জ্বরও থাকে না।
তাই ডেঙ্গুর মৌসুমে যে কোনো ধরনের জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি। জ্বরের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
ঢাকার দুই সিটিতেই অর্ধেকের বেশি মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৪৩ জনের মধ্যে ২২ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। এর মধ্যে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেই মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের—উত্তরে ছয়জন এবং দক্ষিণে ১৫ জন।
অন্যদিকে খুলনায় ছয়জন, ময়মনসিংহে পাঁচজন, চট্টগ্রাম ও বরিশালে চারজন করে এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
আক্রান্তে শীর্ষে বরিশাল
১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৯৮ জন।
বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যা— বরিশাল: ৩,০০২ জন, ঢাকা: ৪,৮৪৪ জন, চট্টগ্রাম: ২,২৭০ জন, খুলনা: ১,৬৮৪ জন, ময়মনসিংহ: ৫২৫ জন, রাজশাহী: ৪৩৮ জন, রংপুর: ২৪৭ জন, সিলেট: ৮৮ জন।
বরিশাল বিভাগে সংক্রমণের হার বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আক্রান্তে পুরুষ বেশি, মৃত্যুর তালিকায় নারী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের ৬১.৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮.৫ শতাংশ নারী।
তবে মৃত্যুর চিত্র ভিন্ন। এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৪৩ জনের মধ্যে ৫৮.১ শতাংশ নারী এবং ৪১.৯ শতাংশ পুরুষ।
বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
২০১৯ সালের চেয়েও বাড়ছে লার্ভার ঘনত্ব
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব হয়েছিল ২০১৯ সালে। সে বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখের বেশি মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চলতি বছরের মৌসুমপূর্ব জরিপে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের ড্রামের ২৩.৯৮ শতাংশ এবং জলমগ্ন মেঝের ২৩.৬৪ শতাংশে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ১১.৪৩ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ।
অর্থাৎ সংক্রমণের আগেই লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু?
জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সারা বছর ধারাবাহিক মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাব। বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক 'অ্যাকটিভ ক্লাস্টার' পদ্ধতির কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া। মশা নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা ও ব্যবহারে যথাযথ তদারকির ঘাটতি। নিজস্ব বৈজ্ঞানিক জরিপ ও নজরদারি ব্যবস্থার অভাব। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করা। দক্ষ জনবলের সংকট। প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়িয়ে জনগণের ওপর অতিরিক্ত দায় চাপানোর প্রবণতা। জরিমানাভিত্তিক অভিযানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতা কার্যক্রমে গুরুত্ব না দেওয়া।
এখনই সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় কেবল ফগার মেশিন বা মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, সারাবছরের এডিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, কার্যকর চিকিৎসা এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ।
কারণ, বর্ষা যত দীর্ঘ হবে, জমে থাকা পানিও তত বাড়বে। আর সেই পানিই যদি এডিস মশার নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়, তবে ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আগামী মাসগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
আরএন