শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের আশায় বাবা-মায়েরা সাধারণত পরিচিত ও দামি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধের ওপর ভরসা করেন। তবে সাম্প্রতিক ল্যাব পরীক্ষায় বাজারে বিক্রি হওয়া কয়েকটি গুঁড়া দুধের মান নিয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। পরীক্ষায় একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধে প্রকৃত দুগ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। বিপরীতে, পণ্যটির ৬৭ দশমিক ৪৪ শতাংশই ভেজাল উপাদান বলে পরীক্ষায় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) খাদ্য পরিদর্শকরা ‘একটি বড় ব্যান্ডের ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’-এর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। ল্যাব রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই গুঁড়া দুধে দুগ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৯২ শতাংশে ভেজাল উপাদান এবং অন্যান্য উপাদানে আরও ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ ভেজাল পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ভেজালের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
পরীক্ষায় গুঁড়া দুধটির পুষ্টিমান নিয়েও গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এতে দুগ্ধ চর্বি থাকার কথা ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একইভাবে, দুগ্ধ প্রোটিন থাকার কথা ছিল অন্তত ৩৪ শতাংশ, অথচ পরীক্ষায় মিলেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এ ঘটনায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত ‘ঐ ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। পরে তিনি আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করেন এবং ভেজাল পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধও ল্যাব পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর মধ্যে আসলাম টি কোম্পানির ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার,সহ একাধিক ব্র্যান্ডের নাম উঠে এসেছে। এসব পণ্যের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ভেজাল পণ্যের প্যাকেটেও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) লোগো ও কিউআর কোড ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিএসটিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব লোগো ও কিউআর কোড নকল হতে পারে। তাই পণ্য কেনার আগে কিউআর কোড স্ক্যান করে নিবন্ধন ও অনুমোদনের তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শুধু গুঁড়া দুধ নয়, আমদানিকৃত কিটক্যাট চকলেটসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্যের মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল ও মানহীন খাবার শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে কিডনি ও মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের উপপরিচালক ডা. মো. আকতার ইমাম বলেন, ভেজাল খাদ্য শিশুদের কিডনি, মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এতে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশু খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও ল্যাব পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে ভেজাল ও মানহীন শিশুখাদ্য ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুত ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ভেজাল ও মানহীন শিশুখাদ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই বাজারে থাকা শিশুখাদ্যের মান নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
-টিএস